ঢাকা মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬,

প্রান্তিক পর্যায়ে সেবা দেবে ডিজিটাল ব্যাংক

বর্তমান সংবাদ | নিজস্ব প্রতিবেদক

সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৬, ০৭:১৬ পিএম

প্রান্তিক পর্যায়ে সেবা দেবে ডিজিটাল ব্যাংক

ঢাকা : দেশের প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনতে চালু হচ্ছে ডিজিটাল ব্যাংক। প্রচলিত ব্যাংকের মতো বড় করপোরেট ঋণ, বৈদেশিক বাণিজ্য বা বড় অঙ্কের ঋণের দিকে না গিয়ে ক্ষুদ্র ও মাইক্রো পর্যায়ের গ্রাহকদের ঋণ দেওয়াই হবে এসব ব্যাংকের অন্যতম লক্ষ্য। শাখা, উপশাখা বা বড় ধরনের জনবল কাঠামো ছাড়াই পুরোপুরি অনলাইনে কার্যক্রম পরিচালনা করবে ডিজিটাল ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক বক্তব্য অনুযায়ী, ডিজিটাল ব্যাংকের মূল লক্ষ্য প্রচলিত ব্যাংকের ব্যবসার সঙ্গে প্রতিযোগিতা নয়; বরং যেসব মানুষ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এখনো প্রচলিত ব্যাংকিংয়ের আওতার বাইরে রয়েছেন, তাদের কাছে আর্থিক সেবা পৌঁছে দেওয়া।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক শীর্ষ কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশের প্রচলিত ব্যাংকগুলোর কাজের একটি নির্দিষ্ট পরিসর রয়েছে। কৃষি, সিএমএসএমই, বৈদেশিক বাণিজ্য ও করপোরেট ঋণসহ বিভিন্ন খাতে তারা সেবা দিচ্ছে। এর পরেও একটি জনগোষ্ঠী ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থেকে যাচ্ছে। এই জনগোষ্ঠীকেই ডিজিটাল ব্যাংকের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, মাইক্রো উদ্যোক্তা এবং যাদের প্রচলিত ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়ার মতো পর্যাপ্ত নথি বা ঋণ ইতিহাস নেই, তাদের বিকল্প তথ্যের ভিত্তিতে ঋণ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওই কর্মকর্তা বলেন, ডিজিটাল ব্যাংকের উদ্দেশ্য প্রচলিত ব্যাংকের গ্রাহক কেড়ে নেওয়া নয়। বরং প্রচলিত ব্যাংকিংয়ের বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিংয়ের আওতায় আনা। এসব ব্যাংকের করপোরেট ঋণ বা বৈদেশিক মুদ্রা-ভিত্তিক ঋণ দেওয়ার সুযোগ থাকবে না বলেও তিনি জানান। গ্রাহক মোবাইল বা অন্যান্য ডিজিটাল মাধ্যমে আবেদন করবেন, পরিচয় যাচাই হবে অনলাইনে, ঋণের সিদ্ধান্ত হবে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থায় এবং অর্থও সরাসরি ডিজিটাল মাধ্যমে দেওয়া যাবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিজিটাল ঋণের ক্ষেত্রে গ্রাহক নির্বাচন, ঋণ মূল্যায়ন, অনুমোদন, বিতরণ ও আদায়- পুরো প্রক্রিয়াই ডিজিটালভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব। এতে প্রশাসনিক ব্যয় ও ভৌগোলিক বাধা কমে ছোট অঙ্কের ঋণও বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর করার সুযোগ তৈরি হয়।

ডিজিটাল ব্যাংকের ক্ষেত্রে বিকাশের জন্য সবচেয়ে বড় সুবিধা হতে পারে তাদের বিদ্যমান ডিজিটাল গ্রাহকভিত্তি ও লেনদেনের তথ্য। ইতোমধ্যে সিটি ব্যাংকের সঙ্গে অংশীদারত্বে বিকাশ অ্যাপের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ঋণ দেওয়ার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত সিটি ব্যাংক-বিকাশ ডিজিটাল ন্যানো ঋণে মোট বিতরণ ১০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এ সময়ে ৩৫ লাখ বিকাশ গ্রাহককে ৩ কোটি ১৯ লাখের বেশি ঋণ হিসাবের মাধ্যমে ঋণ দেওয়া হয়েছে। গড় ঋণের পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার টাকা। এই ব্যবস্থায় গ্রাহকের বিকাশে থাকা লেনদেনের তথ্য বিশ্লেষণ করে ঋণ পাওয়ার যোগ্যতা ও সীমা নির্ধারণ করা হয়। অর্থাৎ প্রচলিত ব্যাংকের মতো শুধু জামানত বা প্রচলিত কাগজপত্রের ওপর নির্ভর না করে বিকল্প তথ্য ব্যবহার করে ক্ষুদ্র ঋণ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

ডিজিটাল ব্যাংক চালু হলে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ব্যবসায় বড় ধরনের প্রভাব পড়বে কি না- এমন প্রশ্নও রয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, দুই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য ও কার্যক্রম এক নয়। এজেন্ট ব্যাংকিং মূলত প্রচলিত ব্যাংকের শাখার বিকল্প হিসেবে প্রত্যন্ত এলাকায় ব্যাংকের প্রতিনিধি বা এজেন্টের মাধ্যমে সেবা পৌঁছে দেয়। বিপরীতে ডিজিটাল ব্যাংকের কোনো শাখা বা উপশাখা থাকবে না। গ্রাহকের সঙ্গে ব্যাংকের সম্পর্ক তৈরি হবে পুরোপুরি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে। ফলে একই গ্রাহক বা একই এলাকার জন্য দুই ব্যবস্থাকে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার সুযোগ কম।

ডিজিটাল ব্যাংকের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হবে, প্রান্তিক গ্রাহকের জন্য ঋণের খরচ কতটা কমানো সম্ভব হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই কর্মকর্তার ব্যাখ্যা হলো, প্রচলিত ব্যাংকের ছোট ঋণের ক্ষেত্রে যে শাখা, জনবল, মাঠপর্যায়ের যোগাযোগ ও আদায় ব্যয় রয়েছে, ডিজিটাল ব্যাংকের ক্ষেত্রে তার বড় অংশই থাকবে না। ফলে পরিচালন ব্যয় কমার সুযোগ রয়েছে।

তবে এর অর্থ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সব ডিজিটাল ঋণের সুদ কম হবে, এমন নিশ্চয়তা এখনই দেওয়া যাচ্ছে না। ঋণের মূল্য নির্ধারণ নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ব্যবসায়িক মডেল, ঝুঁকি, তহবিলের খরচ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের বিধিবিধানের ওপর। ডিজিটাল ব্যাংকের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হতে পারে, গ্রাহককে শুরুতেই বড় ঋণ না দিয়ে তার লেনদেনের ইতিহাস তৈরি করা।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ডিজিটাল ঋণ ছোট অঙ্কের ঋণকে বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর করতে পারে। প্রযুক্তির মাধ্যমে লেনদেন ব্যয় কমানো, ভৌগোলিক দূরত্বের বাধা দূর করা এবং প্রচলিত ঋণ ইতিহাস না থাকা গ্রাহককে বিকল্প তথ্যের ভিত্তিতে মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হয়।

ডিজিটাল ব্যাংক বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী মোহাম্মদ ফিরোজ কবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, আধুনিক ব্যাংক ব্যবস্থা একটি ভালো উদ্যোগ। ব্যাংক হিসাব খোলা থেকে শুরু করে সব ধরনের কার্যক্রম ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় এলে প্রতারণার সুযোগ অনেকটাই কমে আসবে। একই সঙ্গে লেনদেনের তথ্য সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা আরও সহজ হবে। এক ক্লিকেই একজন গ্রাহকের প্রয়োজনীয় তথ্য ও লেনদেনের রেকর্ড দেখার সুযোগ তৈরি হবে।

এ ছাড়া কার্যকরভাবে কেওয়াইসি (গ্রাহক পরিচিতি যাচাই) পদ্ধতি চালু করা গেলে ব্যাংকিং সেবা আরও সহজ ও নিরাপদ হবে। তবে প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষক, দিনমজুরসহ স্বল্পশিক্ষিত মানুষের ক্ষেত্রে ডিজিটাল ব্যাংকিং ব্যবহারে কিছুটা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তাদের প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ করে তুলতে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বাড়াতে হবে।

গত ২৪ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক চারটি নতুন প্রস্তাবিত ডিজিটাল ব্যাংককে লেটার অব ইনটেন্ট (এলওআই) দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এগুলো হলো- বিকাশ ডিজিটাল ব্যাংক, বুস্ট ডিজিটাল ব্যাংক, ডিকে ডিজিটাল ব্যাংক এবং নোভা ডিজিটাল ব্যাংক। একই সঙ্গে আগে অনুমোদন পাওয়া কড়ি ডিজিটাল ব্যাংকের এলওআইও নবায়ন করা হয়েছে। ফলে প্রাথমিক অনুমোদন পাওয়া ডিজিটাল ব্যাংকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে পাঁচটিতে।

তবে এলওআই চূড়ান্ত ব্যাংকিং লাইসেন্স নয়। নির্ধারিত প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, নিয়ন্ত্রক শর্তসহ অন্যান্য প্রস্তুতি সম্পন্ন করার পরই প্রতিষ্ঠানগুলোকে চূড়ান্ত লাইসেন্স দেওয়া হবে। ডিজিটাল ব্যাংকের ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধনও ৩০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এমটিআই

বর্তমান সংবাদ

Madrasatun Nur Al Islamiyyah Mossharrof Hossain
Tasneem Sinha
Projapoti Holdings Ltd
Link copied!