ঢাকা মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬,

‘হয়তো কিছুদিন পর চুল পড়ে যাবে’—ক্যানসারের লড়াইয়ে উপস্থাপক সামিয়া

বর্তমান সংবাদ | বিনোদন প্রতিবেদক

আগস্ট ২৪, ২০২৬, ০৮:১১ পিএম

‘হয়তো কিছুদিন পর চুল পড়ে যাবে’—ক্যানসারের লড়াইয়ে উপস্থাপক সামিয়া

ঢাকা : পাঁচ বছর ধরে ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করছেন উপস্থাপক সামিয়া আফরিন। দীর্ঘ চিকিৎসার পর পরিস্থিতি স্থিতিশীল হয়েছিল, ফিরেছিলেন স্বাভাবিক জীবনেও। কিন্তু সেই স্বস্তির মধ্যেই তিন মাস আগে তাঁর শরীরে দ্বিতীয়বারের মতো ম্যালিগন্যান্ট টিউমার ধরা পড়ে। এবার ওভারিয়ান ক্যানসার। দ্রুত অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে। পরীক্ষায় এটি ‘হাই-গ্রেড কার্সিনোমা’ হিসেবে শনাক্ত হওয়ায় এখন কেমোথেরাপি নিতে হচ্ছে তাঁকে। গতকাল রোববার নিজের ফেসবুক স্ট্যাটাসে ক্যানসারের সঙ্গে নতুন এই লড়াইয়ের কথা জানিয়েছেন সামিয়া।

কেমোথেরাপির কারণে চুল পড়ে যেতে পারে—চিকিৎসকের কাছ থেকে আগেই জেনেছেন সামিয়া। তাই বিষয়টি নিয়ে মন খারাপ না করে নিজেই চুল ছোট করে নতুন লুক নিয়েছেন। সেই মুহূর্তের একটি ভিডিও ফেসবুকে প্রকাশ করে জানিয়েছেন, কঠিন এই সময়টাকেও নিজের মতো করে গ্রহণ করতে চান তিনি।

সামিয়া লিখেছেন, ‘মাত্র তিন মাস আগে আমার শরীরে দ্বিতীয় ম্যালিগন্যান্ট ধরা পড়ে—ওভারিয়ান ক্যানসার। ইমিডিয়েটলি অপারেশন করতে হয়। দুর্ভাগ্যবশত, এটি ছিল হাই-গ্রেড কার্সিনোমা, তাই এখন আমাকে কেমোথেরাপির মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে।’

এবারই প্রথম কেমোথেরাপির অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন তিনি। প্রথমবার ক্যানসার ধরা পড়ার পর তাঁর চিকিৎসা হয়েছিল ইমিউনোথেরাপির মাধ্যমে। সামিয়া লিখেছেন, ‘গত পাঁচ বছর ধরে ক্যানসারের সঙ্গে যুদ্ধ করছি। প্রথমবার কেমো নিতে হয়নি, ইমিউনোথেরাপির মাধ্যমে চিকিৎসা চলেছিল। এবারের অভিজ্ঞতা তাই আমার কাছে একটু অন্য রকম।’

চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, কেমোর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় তাঁর চুল পড়ে যেতে পারে। বিষয়টি সামিয়া দেখছেন অন্যভাবে। তাঁর ভাষায়, ‘ডাক্তার বলেছেন, কেমোর কারণে চুল পড়ে যেতে পারে। তাই বিষয়টাকে নিয়ে মন খারাপ না করে বরং স্পন্টেনিয়াসলি অ্যাকসেপ্ট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সবকিছু নিয়ে মন খারাপ করে তো লাভ নেই—সময়ের সঙ্গে নিজেকে অ্যাডাপ্ট করতে পারাটাই আসল।’ সেই ভাবনা থেকেই চুল ছোট করেছেন তিনি।

ক্যানসারের চিকিৎসার কঠিন অভিজ্ঞতার কথাও উঠে এসেছে তাঁর লেখায়। যাঁরা একই লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে গেছেন, তাঁরাই এর কষ্ট সবচেয়ে ভালো বুঝবেন বলে মনে করেন সামিয়া। লিখেছেন, ‘যাঁরা এই পথের মধ্য দিয়ে গেছেন, তাঁরাই জানেন—এই লড়াইটা কতটা কঠিন। আমি সত্যিই চাই না, আমার কাছের কোনো মানুষকে কখনো এমন একটা জার্নির মধ্য দিয়ে যেতে হোক।’

শেষে সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন উপস্থাপক, ‘আল্লাহ যেন সবকিছু সহজ করে দেন, আগেরবারের মতো এবারও যেন আমার শক্তিটা ধরে রাখতে পারি এবং খুব শিগগিরই আমার স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরে যেতে পারি।’

২০২২ সালে লড়াই শুরু : সামিয়া আফরিনের ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই শুরু হয় ২০২২ সালে। ওই বছরের এপ্রিলে শারীরিক অস্বস্তি অনুভব করার পর ঢাকার একটি হাসপাতালে পরীক্ষা করান। তখন তাঁর শরীরে ক্যানসারের জীবাণুবাহী টিউমার ধরা পড়ে। এরপর স্বামীকে নিয়ে দ্রুত সিঙ্গাপুরে যান তিনি।

আগের এক সাক্ষাৎকারে প্রথম আলোকে সামিয়া জানিয়েছিলেন, শুরুতে তাঁর বিশ্বাসই হচ্ছিল না যে ক্যানসার হয়েছে। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করতেন, নিয়মিত শরীরচর্চাও করতেন। তাই তাঁর মনে হয়েছিল, হয়তো কোথাও কোনো ভুল হচ্ছে। কিন্তু সিঙ্গাপুরে বিস্তারিত পরীক্ষার পর জানা যায়, তিনি কোলন ক্যানসারে আক্রান্ত এবং সেটি চতুর্থ ধাপে পৌঁছে গেছে। ক্যানসার ছড়িয়ে পড়েছিল ফুসফুস ও লিম্ফ নোডেও।

খবরটি ছিল তাঁর জন্য বড় ধাক্কা। প্রথম দিকে চিকিৎসকেরা অস্ত্রোপচারসহ এমন কিছু চিকিৎসাপদ্ধতির কথা জানিয়েছিলেন, যাতে তাঁর স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন আসতে পারত। বিষয়টি মেনে নিতে না পেরে একপর্যায়ে চিকিৎসাই না নেওয়ার কথা ভেবেছিলেন সামিয়া।

পরে সিঙ্গাপুরের একটি সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকেরা তাঁকে ইমিউনোথেরাপির পরামর্শ দেন। ২১ দিন পরপর নিতে হতো ডোজ। ব্যয়বহুল সেই চিকিৎসাপদ্ধতিতেই শেষ পর্যন্ত ভরসা রাখেন তিনি।

কাউকে বুঝতে দিতে চাননি : ইমিউনোথেরাপির প্রথম কয়েক মাস সামিয়ার জন্য সহজ ছিল না। চিকিৎসার পর এতটাই দুর্বল হয়ে পড়তেন যে কখনো ১০ কদম হাঁটার শক্তিও থাকত না। শরীর কাঁপত, ত্বকে নানা সমস্যা দেখা দিত। তারপরও অসুস্থতাকে জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসতে চাননি।

প্রথম আলোকে তিনি বলেছিলেন, ‘মানসিকভাবে ভাবতে চাইনি যে আমি অসুস্থ। অসুস্থতার কারণে আমি এই কাজ করতে পারব না, সেই কাজ করতে পারব না, এটা ভাবতে চাইনি।’

চিকিৎসার মধ্যেও তাই অফিস করেছেন, কাজ করেছেন, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় যোগ দিয়েছেন। এমনও হয়েছে, চিকিৎসার ডোজ নিয়ে বাসায় ফিরে ৩০ মিনিট বিশ্রাম নিয়ে বন্ধুদের আড্ডায় যোগ দিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, ‘ওগুলো তো বন্ধ করা যাবে না। সবকিছু চালাতে হবে।’

ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার খবরও দীর্ঘদিন নিজের মধ্যে রেখেছিলেন সামিয়া। পরিবার ও খুব কাছের কয়েকজন বন্ধু ছাড়া তেমন কেউ জানতেন না। কারণ, অসুস্থতার কারণে মানুষের সহানুভূতি নিতে চাননি তিনি।

দুই বছরের চিকিৎসা কোর্স শেষ হওয়ার পর তাঁর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল হয়ে আসে। দীর্ঘ সময় কোনো চিকিৎসাও নিতে হয়নি। চিকিৎসকেরা তখন আশাবাদী ছিলেন, ক্যানসার আর ছড়াচ্ছে না। সামিয়াও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক কাজকর্মে ফিরেছিলেন।

সেই স্বস্তির সময় পেরিয়ে সামিয়ার সামনে এখন নতুন লড়াই। এবার চিকিৎসাপদ্ধতিও নতুন—ইমিউনোথেরাপির বদলে নিতে হচ্ছে কেমোথেরাপি। তবে পাঁচ বছর আগে যে মানসিক শক্তি নিয়ে ক্যানসারের মুখোমুখি হয়েছিলেন, এবারও সেটিই ধরে রাখতে চান তিনি। চুল পড়ে যাওয়ার আগেই নতুন লুক বেছে নেওয়ার মধ্য দিয়ে যেন সেই বার্তাই দিলেন সামিয়া—পরিস্থিতি বদলালেও জীবনকে নিজের মতো করে গ্রহণ করে সামনে এগিয়ে যেতে চান তিনি।

এমটিআই

বর্তমান সংবাদ

Madrasatun Nur Al Islamiyyah Mossharrof Hossain
Tasneem Sinha
Projapoti Holdings Ltd
Link copied!