ঢাকা মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬,

বাংলাদেশে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণ

বর্তমান সংবাদ | মো. সাখাওয়াৎ হোসেন

অক্টোবর ১২, ২০২৬, ০৬:৩১ পিএম

বাংলাদেশে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণ

ঢাকা : জ্ঞানসমৃদ্ধ, দক্ষ, সৃজনশীল, দায়িত্বশীল এবং সামাজিকভাবে সচেতন নাগরিক গড়ে তোলার জন্য উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে মানসম্মত শিক্ষা অপরিহার্য। বাংলাদেশে মাধ্যমিক শিক্ষা সাধারণত শিক্ষার্থীদের বুদ্ধিবৃত্তিক, আবেগিক ও সামাজিক বিকাশের এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে সহায়তা প্রদান করে। এটি এমন একটি সময় যখন শিক্ষার্থীরা গভীরতর প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান অর্জন করে, নিজেদের আগ্রহের ক্ষেত্রগুলো খুঁজে পায়, উচ্চশিক্ষা বা কর্মসংস্থানের জন্য প্রস্তুতি নেয় এবং সমাজ ও নাগরিকত্ব বিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলে। তাই এই পর্যায়ে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য কেবল পরীক্ষার ফলাফল ভালো করার চেয়েও বেশি কিছুর প্রয়োজন। এর জন্য প্রয়োজন যোগ্য শিক্ষক, যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম, সহায়ক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কার্যকর মূল্যায়ন পদ্ধতি, উপযুক্ত প্রযুক্তি, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার পরিবেশ এবং পরিবার, সমাজ ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অর্থবহ সহযোগিতা।

উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে মানসম্মত শিক্ষার প্রথম শর্ত হলো যোগ্য এবং পর্যাপ্ত সহায়তা-প্রাপ্ত শিক্ষক। শিক্ষণ প্রক্রিয়ায় শিক্ষকরাই কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেন; কারণ কার্যকর পাঠদান ছাড়া সুপরিকল্পিত পাঠ্যক্রম বা আধুনিক সুযোগ-সুবিধাও ভালো শিক্ষাগত ফলাফল বয়ে আনতে পারে না। শিক্ষকদের বিষয়ভিত্তিক গভীর জ্ঞানের পাশাপাশি শিক্ষাদান-সংক্রান্ত দক্ষতা (pedagogical skills) থাকা প্রয়োজন। তাঁদের কৈশোরকালীন বিকাশ, শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যক্তিগত পার্থক্য, শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনা, মূল্যায়ন পদ্ধতি, ডিজিটাল শিক্ষা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে। শিক্ষকদের জ্ঞান ও পাঠদান পদ্ধতি হালনাগাদ করার জন্য ধারাবাহিক পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ থাকা জরুরি। শক্তিশালী শিক্ষাব্যবস্থা বজায় রাখার ক্ষেত্রে শিক্ষকদের পেশাগত প্রস্তুতি ও ধারাবাহিক উন্নয়নের গুরুত্ব ফিনল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও জাপানের মতো দেশগুলোর উদাহরণ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়।

পাঠ্যক্রমটি বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের চাহিদা এবং পরিবর্তনশীল বিশ্বের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত। উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষায় বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান, সামাজিক বিজ্ঞান, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শক্ত ভিত্তি গড়ে তোলার পাশাপাশি ব্যবহারিক দক্ষতা বিকাশের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানের সাথে বাস্তব জীবনের সমস্যাগুলোর সংযোগ স্থাপনের সুযোগ শিক্ষার্থীদের জন্য থাকা দরকার। এছাড়া পরিবেশ সচেতনতা, আর্থিক সাক্ষরতা, স্বাস্থ্য শিক্ষা, গণমাধ্যম সাক্ষরতা, নাগরিকত্ববোধ, নৈতিকতা এবং পেশা বিষয়ক সচেতনতাও যথাযথভাবে পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। পাঠ্যক্রম সংস্কারের সময় এমন অতিরিক্ত বিষয়বস্তু বর্জন করা উচিত যা না বুঝে মুখস্থ করার প্রবণতাকে উৎসাহিত করে।

শিক্ষাদান পদ্ধতিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মানসম্মত শিক্ষার জন্য এমন শ্রেণিকক্ষ প্রয়োজন যেখানে শিক্ষার্থীরা কেবল বক্তৃতা শোনা বা তথ্য মুখস্থ করার পরিবর্তে শিক্ষণ প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। বিষয়বস্তু ও শিক্ষার উদ্দেশ্যের ওপর ভিত্তি করে শিক্ষকরা আলোচনা, প্রশ্নোত্তোর, প্রদর্শন (demonstration), যৌথ কার্যক্রম, প্রকল্প, পরীক্ষণ, সমস্যা সমাধান, গবেষণা ও উপস্থাপনার মতো পদ্ধতিগুলো ব্যবহার করতে পারেন। কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন শিক্ষা ব্যবস্থায় ব্যবহৃত অনুসন্ধান-ভিত্তিক পদ্ধতিগুলো দেখায় যে, কীভাবে শিক্ষার্থীদের কেবল তথ্য মুখস্থ করার পরিবর্তে প্রশ্ন অনুসন্ধান করতে এবং জ্ঞান প্রয়োগ করতে উৎসাহিত করা যায়। মূল্যায়ন শিক্ষার একমাত্র উদ্দেশ্য না হয়ে, শিখনকে সহায়তা করবে। বাংলাদেশ ঐতিহ্যগতভাবে আনুষ্ঠানিক পরীক্ষার ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। পরীক্ষা নির্দিষ্ট ধরনের কৃতিত্ব পরিমাপ করতে পারে, কিন্তু মানসম্মত শিক্ষার জন্য একটি বৃহত্তর মূল্যায়ন ব্যবস্থা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি বোঝার জন্য শিক্ষকেরা শ্রেণিকক্ষে প্রশ্নোত্তর পর্ব, বাড়ির কাজ, প্রকল্প, উপস্থাপনা, ব্যবহারিক কার্যক্রম, পোর্টফোলিও এবং গঠনমূলক মূল্যায়ন ব্যবহার করতে পারেন। আন্তর্জাতিক শিক্ষা ব্যবস্থাগুলো শিখনের জন্য মূল্যায়নের ওপর ক্রমবর্ধমানভাবে জোর দিচ্ছে, যেখানে মূল্যায়ন থেকে প্রাপ্ত তথ্য অসুবিধা চিহ্নিত করতে এবং শিক্ষাদানের উন্নতি করতে ব্যবহৃত হয়। শিক্ষার্থীদেরও গঠনমূলক মতামত দেওয়া উচিত, যা তাদের উন্নতির পথ ব্যাখ্যা করে।

পঠন ও লিখন দক্ষতার উন্নয়ন একটি মৌলিক অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। যেসব শিক্ষার্থী জটিল পাঠ্য বিষয় বুঝতে পারে না বা স্পষ্টভাবে নিজেদের ধারণা প্রকাশ করতে পারে না, তারা প্রায় প্রতিটি বিষয়েই অসুবিধার সম্মুখীন হবে। তাই স্কুলগুলোর উচিত পাঠ্যবইয়ের বাইরেও পড়াশোনায় শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করা—যেমন লাইব্রেরি, রিডিং ক্লাব, সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন, সাহিত্য, জীবনীগ্রন্থ, বৈজ্ঞানিক উপকরণ এবং বয়সোপযোগী ডিজিটাল রিসোর্সের মাধ্যমে। স্কুলের লাইব্রেরিগুলো কেবল নামমাত্র বা আনুষ্ঠানিক স্থাপনা হিসেবে না থেকে বরং কার্যকর ও সবার জন্য সহজলভ্য হওয়া প্রয়োজন। একটি শক্তিশালী পঠন-সংস্কৃতি শিক্ষার্থীদের শব্দভাণ্ডার, বিষয় বোঝার ক্ষমতা, কল্পনাশক্তি, বিশ্লেষণধর্মী চিন্তাভাবনা এবং স্বাধীনভাবে শেখার দক্ষতা বৃদ্ধি করতে পারে।

বিজ্ঞান ও গণিত শিক্ষার প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন, কারণ এগুলো বিশ্লেষণধর্মী চিন্তাভাবনা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের জন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা, তথ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করা, সমস্যার সমাধান করা এবং দৈনন্দিন জীবনে বৈজ্ঞানিক নীতিগুলো কীভাবে কাজ করে তা বোঝার সুযোগ থাকা উচিত। যেখানে গবেষণাগারের সুযোগ-সীমিত, সেখানে প্রচলিত গবেষণাগারের বিকল্প বা পরিপূরক হিসেবে স্বল্প খরচের পরীক্ষা-নিরীক্ষা, স্থানীয়ভাবে প্রাপ্ত উপকরণ, সিমুলেশন এবং সুপরিকল্পিত ব্যবহারিক কার্যক্রম ব্যবহার করা যেতে পারে। দক্ষিণ কোরিয়া ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলো তাদের সামগ্রিক জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের অংশ হিসেবে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত শিক্ষায় ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে।

সঠিক ও উদ্দেশ্যমূলক ব্যবহারের মাধ্যমে ডিজিটাল প্রযুক্তি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান আরও উন্নত করতে পারে। স্কুলগুলো শিক্ষার্থীদের জন্য কম্পিউটার, নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট সংযোগ, ডিজিটাল লার্নিং প্ল্যাটফর্ম, শিক্ষামূলক ভিডিও, ই-বুক, সিমুলেশন এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণের ব্যবস্থা করতে পারে। তবে প্রযুক্তির ব্যবহার যেন দক্ষ শিক্ষকের বিকল্প হয়ে না দাঁড়ায় বা প্রযুক্তি যেন নিজেই একমাত্র লক্ষ্য হয়ে না ওঠে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। উপযুক্ত ডিজিটাল রিসোর্স নির্বাচন এবং পাঠদানের ক্ষেত্রে সেগুলোর যথাযথ ব্যবহারের জন্য শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের প্রয়োজন। প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের কাছে শিক্ষার উপকরণ পৌঁছে দিতে এবং শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নে বাংলাদেশও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সহায়তা নিতে পারে।

মানসম্মত শিক্ষা অবশ্যই অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে হবে। শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন অর্থনৈতিক, ভৌগোলিক, ভাষাগত, সাংস্কৃতিক ও পারিবারিক পটভূমি থেকে আসে এবং তাদের কারও কারও বিশেষ চাহিদা বা প্রতিবন্ধকতা থাকতে পারে। দারিদ্র্য, লিঙ্গ, প্রতিবন্ধকতা, অবস্থান বা সামাজিক পরিস্থিতির কারণে কোনো শিক্ষার্থী যেন শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয়, তা স্কুলগুলোকে নিশ্চিত করতে হবে। সহজগম্য ভবন, উপযুক্ত শিক্ষণ-উপকরণ, সহায়তাকারী শিক্ষক, প্রয়োজনে বৃত্তি বা আর্থিক সহায়তা এবং নমনীয় শিক্ষাদান পদ্ধতি শিক্ষার ক্ষেত্রে বিদ্যমান বাধাগুলো কমাতে সাহায্য করতে পারে। কানাডা, নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলোর অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা কার্যক্রম থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশ তা স্থানীয় পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে বাস্তবায়ন করতে পারে।

স্কুলের ভৌত পরিবেশও শিক্ষার্থীদের শেখার প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলে। শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজন নিরাপদ শ্রেণিকক্ষ, পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের ব্যবস্থা, বিশুদ্ধ পানীয় জল, স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন সুবিধা, উপযুক্ত আসবাবপত্র, লাইব্রেরি, গবেষণাগার, খেলার মাঠ এবং প্রয়োজনে নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থা। গ্রামীণ ও সুবিধাবঞ্চিত এলাকার স্কুলগুলোতে অতিরিক্ত সরকারি বিনিয়োগের প্রয়োজন হতে পারে, কারণ সম্পদের অসম বন্টন শিক্ষার সুযোগের ক্ষেত্রেও বৈষম্য সৃষ্টি করতে পারে। তাই অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে কেবল সহজে প্রবেশযোগ্য এলাকাগুলোর ওপর মনোযোগ না দিয়ে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।

শিক্ষার্থীদের সার্বিক ভালো থাকাকে (well-being) মানসম্মত শিক্ষার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বয়ঃসন্ধিকালে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার চাপ, পারিবারিক সমস্যা, সামাজিক দ্বন্দ্ব, বুলিং বা হেনস্তা, উদ্বেগ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মতো পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে পারে। স্কুলগুলোতে এমন একটি সহায়ক পরিবেশ গড়ে তোলা উচিত যেখানে শিক্ষার্থীরা শিক্ষক, কাউন্সিলর বা অন্যান্য প্রশিক্ষিত কর্মীর কাছ থেকে সহায়তা চাইতে পারে। বুলিং-বিরোধী পদক্ষেপ, সম্মানজনক ও গঠনমূলক শৃঙ্খলাবোধ, মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা, শারীরিক শিক্ষা, খেলাধুলা, শিল্পকলা এবং পাঠ্যক্রম-বহির্ভূত কার্যক্রম স্কুলের পরিবেশকে আরও স্বাস্থ্যকর করে তুলতে সহায়তা করতে পারে। শিক্ষার লক্ষ্য হওয়া উচিত শিক্ষার্থীর সামগ্রিক বিকাশ সাধন করা, কেবল পরীক্ষার ফলাফলের ওপর এককভাবে মনোযোগ দেওয়া নয়।

বিদ্যালয়ের বলিষ্ঠ নেতৃত্ব আরেকটি অপরিহার্য শর্ত। প্রধান শিক্ষক ও বিদ্যালয় পরিচালকদের শিক্ষাসংক্রান্ত অগ্রাধিকার নির্ধারণ, শিক্ষকদের সহায়তা প্রদান, শ্রেণিকক্ষের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, পরিবারের সাথে যোগাযোগ রক্ষা এবং বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে সক্ষম হতে হবে। বিদ্যালয়ের নেতৃত্ব হতে হবে স্বচ্ছতা, পারস্পরিক সহযোগিতা, পেশাগত দায়বদ্ধতা এবং তথ্য-প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। নিয়মিত পর্যবেক্ষণের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত কেবল প্রশাসনিক নিয়মকানুন পালন নিশ্চিত করা নয়, বরং শিক্ষাদান ও শেখার প্রক্রিয়ার মান উন্নয়ন করা।

পরিবার ও সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ মাধ্যমিক শিক্ষাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। পরীক্ষার ফলাফলের জন্য অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করে অভিভাবকদের উচিত বিদ্যালয়ের সাথে যোগাযোগ রাখা এবং সন্তানের পড়াশোনার বিষয়ে আগ্রহ দেখানো। বিদ্যালয়গুলো অভিভাবক-শিক্ষক সভা, শিক্ষামূলক কর্মশালা, পেশা বিষয়ক আলোচনা, পঠন-পাঠন কার্যক্রম এবং সামাজিক কর্মসূচির আয়োজন করতে পারে। স্থানীয় সংগঠন, গ্রন্থাগার, বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এবং পেশাজীবীরা প্রয়োজনীয় সম্পদ, পরামর্শদান (মেন্টরিং), পেশা বিষয়ক তথ্য এবং হাতে-কলমে শেখার সুযোগ প্রদানের মাধ্যমে অবদান রাখতে পারেন।

উচ্চমাধ্যমিক বা হাইস্কুল পর্যায়ে পেশা ও বৃত্তিমূলক প্রস্তুতির বিষয়টিও আরও জোরদার করা প্রয়োজন। সব শিক্ষার্থী একই শিক্ষাপথ অনুসরণ করবে না; তাই উচ্চশিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, উদ্যোক্তা হওয়া এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের তথ্য ও নির্দেশনা পাওয়া উচিত। জার্মানি ও সুইজারল্যান্ডের মতো দেশগুলো দেখিয়েছে যে, শিক্ষা ও বৃত্তিমূলক পথের মধ্যে শক্তিশালী সংযোগ কীভাবে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয় থেকে কর্মজীবনে প্রবেশের পথ সুগম করতে পারে। মানসম্মত সাধারণ শিক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাংলাদেশ তার কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার ব্যবস্থাকেও শক্তিশালী করতে পারে।

পরিশেষে, মানসম্মত শিক্ষার জন্য প্রয়োজন কার্যকর সরকারি নীতিমালা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং জবাবদিহিতা। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কেবল বিদ্যালয় ভবন নির্মাণের ওপর গুরুত্ব না দিয়ে শিক্ষক উন্নয়ন, শিক্ষা উপকরণ, গ্রন্থাগার, গবেষণাগার, ডিজিটাল অবকাঠামো, শিক্ষার্থীদের সহায়তা এবং শিক্ষাবিষয়ক গবেষণার ওপরও জোর দেওয়া উচিত। বিভিন্ন অঞ্চল, আর্থ-সামাজিক গোষ্ঠী এবং বিদ্যালয়ের ধরনের মধ্যে শেখার ফলাফলের পার্থক্য চিহ্নিত করতে তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করা প্রয়োজন। সফল কর্মসূচিগুলোর পরিসর বাড়াতে হবে এবং অকার্যকর কর্মসূচিগুলোর প্রয়োজনীয় সংস্কার বা পরিবর্তন করতে হবে।

অবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে একটি সামগ্রিক ও দীর্ঘমেয়াদী কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন। দক্ষ শিক্ষক, যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম, শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক শিক্ষাদান পদ্ধতি, কার্যকর মূল্যায়ন ব্যবস্থা, পঠন দক্ষতা ও ‘স্টেম’ (STEM) শিক্ষার ওপর জোর, উপযুক্ত প্রযুক্তির ব্যবহার, অন্তর্ভুক্তিমূলক বিদ্যালয় পরিবেশ, নিরাপদ অবকাঠামো, শিক্ষার্থীদের সার্বিক কল্যাণ, বলিষ্ঠ নেতৃত্ব, পরিবার ও সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ, পেশা বিষয়ক প্রস্তুতি এবং কার্যকর সরকারি নীতিমালার সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য। বিশ্বব্যাপী অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে যে, সফল শিক্ষাব্যবস্থা কোনো একক সংস্কারের ওপর নির্ভর করে না; বরং তারা এমন একটি সুসংহত ব্যবস্থা গড়ে তোলে যেখানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, বিদ্যালয়, পরিবার, সম্প্রদায় এবং সরকার—সবাই শিক্ষার বিষয়ে যৌথ দায়িত্ব পালন করে। বিশাল এবং ক্রমশ শিক্ষিত হয়ে ওঠা তরুণ জনগোষ্ঠীর কারণে বাংলাদেশের সামনে রয়েছে অপার সম্ভাবনা। মাধ্যমিক শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে ধারাবাহিক বিনিয়োগের মাধ্যমে এবং শহরের পাশাপাশি গ্রামীণ বিদ্যালয়গুলোতেও প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম পৌঁছে দিয়ে দেশটি তার তরুণদের এমনভাবে গড়ে তুলতে পারে—যাতে তারা প্রয়োজনীয় জ্ঞান, দক্ষতা, সৃজনশীলতা, আত্মবিশ্বাস ও মূল্যবোধ অর্জন করে জাতীয় উন্নয়নে অর্থবহ অবদান রাখতে এবং ক্রমশ আন্তঃসংযুক্ত হয়ে ওঠা বিশ্বে সফলভাবে অংশগ্রহণ করতে সক্ষম হয়।

এমটিআই

বর্তমান সংবাদ

Madrasatun Nur Al Islamiyyah Mossharrof Hossain
Tasneem Sinha
Projapoti Holdings Ltd
Link copied!