ঢাকা শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,
যেখানে নিভল ১৪ প্রাণ

উৎসুক মানুষের ভিড়, পড়ে আছে চুষনি-জুতা, টুকরা কাচ

বর্তমান সংবাদ | বাগেরহাট প্রতিনিধি

মার্চ ১৩, ২০২৬, ০৮:৫১ পিএম

উৎসুক মানুষের ভিড়, পড়ে আছে চুষনি-জুতা, টুকরা কাচ

বাগেরহাট : সড়কের ঢালজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অসংখ্য কাচের টুকরা। গাড়ির ভাঙা নানা অংশের সঙ্গে পড়ে আছে কয়েক জোড়া জুতা-স্যান্ডেল। এর মাঝেই নজরে পড়ে একটি শিশুর চুষনি।

শুক্রবার সকালে বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার বেলাই ব্রিজ এলাকার খুলনা-মোংলা মহাসড়কে দেখা যায় এ দৃশ্য। এখানেই বর-কনেবাহী মাইক্রোবাসটিতে ঘটে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। বিয়ের আনন্দযাত্রা মুহূর্তেই রূপ নেয় শোকে।

বৃহস্পতিবার বিকালে নৌ-বাহিনীর বাসের সঙ্গে একটি মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ১৪ জন নিহত হন। তাদের মধ্যে চার জনই শিশু। যাদের মধ্যে দুই শিশুর বয়স দুই বছরের নিচে। মারা গেছেন তাদের মায়েরাও।

গাড়িতে শিশু সন্তানদের শান্ত রাখতে মা হয়তো তাদের চুষনি মুখে তুলে দিয়েছিলেন। বিয়ে উপলক্ষে বর ও কনের পরিবারের স্বজনেরা হয়তো কিনেছিলেন নতুন জুতো। কিন্তু এখন মা-সন্তান কিংবা বিয়ের আনন্দে মেতে থাকা যাত্রীরা কেউই আর নেই এই পৃথিবীতে।

দুর্ঘটনার বেশ কয়েক ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও স্থানীয় বাসিন্দা ও উৎসুক লোকজন এখনও ভিড় করছেন ঘটনাস্থলে। আশেপাশে পুরো এলাকায় শোক ও হতবিহ্বল পরিবেশ। যারা দেখছে এসেছেন, তাদের কারো কারো চোখে অশ্রু আর মুখে স্তব্ধতা।

ঘটনাস্থলের অদূরে রফিকুল ইসলামের বাড়ি। শুক্রবার সকালে তাকে দেখা গেল, গভীর মনোযোগ দিয়ে রাস্তার উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কাঁচের টুকরো জুতো ও অন্যান্য সরঞ্জামাদির দিকে তাকিয়ে থাকতে।

কী ঘটেছিল জানতে চাইলে তিনি বলেন, জীবনে এত বড় দুর্ঘটনা দেখি নাই। আমার চোখের সামনেই বলা চলে। মাঠে গরু রেখে ঘরে ফিরছি মাত্র। হঠাৎ শুনি বিকট শব্দ।

প্রথমে ভেবেছি গরুটা হয়ত বাসের সামনে পড়েছে। পরে দেখি দুই গাড়ির সংঘর্ষ। রক্ত আর মরা মানুষ। একসঙ্গে এত আহত মানুষ সরাসরি আগে কখনো দেখিনি।

রফিকুলের মত স্থানীয় অনেকই ঘটনাস্থলে এসে নিহতদের পরিবারের কথা স্মরণ করে সমবেদনা প্রকাশ করছেন।

বাগেরহাটের মোংলা উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন শেহলা বুনিয়া এলাকার বাসিন্দা ও মোংলা পোর্ট পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আব্দুর রাজ্জাকের ছোট ছেলে আহাদুর রহমান সাব্বিরের সঙ্গে খুলনার কয়রা উপজেলার আমাদী ইউনিয়নের নাকসা গ্রামের মার্জিয়া আক্তার মিতুর বিয়ে হয়।

বৃহস্পতিবার দুপুরে নববধূ মিতু নিয়ে মোংলায় বাড়ি ফিরছিলেন বরের পরিবারের সদস্যরা। তাদের বহনকারী মাইক্রোবাসটি মোংলার কাছাকাছি রামপাল উপজেলার বেলাইব্রিজ এলাকায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা নৌ-বাহিনীর একটি স্টাফ বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। ভয়াবহ ওই দুর্ঘটনায় বর ও কনে এবং মাইক্রোবাসের চালকসহ ১৪ জনের প্রাণ যায়।

দুর্ঘটনাস্থল থেকে রাজ্জাকের বাড়ির গন্তব্য ছিল মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরে। ভয়াবহ ওই দুর্ঘটনায় মোংলার এই বর ও কনের আর বাড়ি ফেরা হল না।

বরের পক্ষের নিহতরা হলেন- বর আহাদুর রহমান সাব্বির, তার বাবা আব্দুর রাজ্জাক, ভাই আব্দুল্লাহ সানি, বোন উম্মে সুমাইয়া ঐশী, তার ছেলে সামিউল ইসলাম ফাহিম, বড় ভাই আশরাফুল আলম জনির স্ত্রী ফারহানা সিদ্দিকা পুতুল, তাদের ছেলে আলিফ, আরফা ও ইরাম।

শুক্রবার (১৩ মার্চ) ভোরে তাদের মরদেহ বাগেরহাটের মোংলার শেহালাবুনিয়ায় পৌঁছায়। আর কনে, তার বোন, দাদি ও নানির লাশ নেওয়া হয় খুলনার কয়রা উপজেলায়।

তারা হলেন- কনে মার্জিয়া আক্তার (মিতু), তার ছোট বোন লামিয়া আক্তার, দাদি রাশিদা বেগম ও নানি আনোয়ারা বেগম।

নিহতদের মধ্যে আরেকজন হলেন মাইক্রোবাস চালক নাইম। তার বাড়ি বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার পেড়িখালি ইউনিয়নের সিংগেরবুনিয়া গ্রামে।

সকালে হাঁটতে হাঁটতে শিশু সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে দুর্ঘটনাস্থলে আসেন শান্তি রানী বিশ্বাস। তার চোখেমুখে আতঙ্ক আর কৌতুহলের ছাপ।

শান্তি বলছিলেন, রাতে খবরে দেখেছি, কি ভয়াবহ দুর্ঘটনা! তাই দেখতে এলাম।

কেবল উৎসুক লোকজনই নয়, সড়কের চলাচলকারী বিভিন্ন যানবাহনের চালকদেরও গাড়ি থামিয়ে দুর্ঘটনাস্থলে দাঁড়াতে দেখা যায়।

কাটাখালি হাইওয়ে থানার ওসি মো. জাফর আহমেদ বলেন, রাতেই ওই স্থান থেকে দুর্ঘটনা কবলিত যানবাহন দুটি থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। আর পরিবারের আবেদনের প্রেক্ষিতে ময়নাতদন্ত ছাড়াই নিহতদের মরাদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

বিয়ের বাড়িতে বিষাদের ছায়া : বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার আগেই ছেলে আর তার নববধূকে নিয়ে মোংলা উপজেলার শেলাবুনিয়ায় নিজ বাড়িতে পৌঁছনোর কথা ছিল বিএনপি নেতা আব্দুর রাজ্জাক ও তার স্বজনদের। আত্মীয় স্বজন ও প্রতিবেশীরাও তখন অপেক্ষা করছিলেন বর-বউকে বরণের জন্য।

সবকিছু ঠিক থাকলে শুক্রবার (১৩ মার্চ) সকালে গ্রাম বাংলার চিরাচরিত নিয়ম অনুযায়ী, নতুন বর-বউকে নিয়ে খুনসুটি আর খাওয়া-দাওয়া এবং বাচ্চাদের হৈ-হুল্লোরে মুখরিত থাকত বাড়িটি। কিন্তু থমকে গেছে সব। বাড়ি ও আশপাশ জুড়ে শত শত মানুষ ছুটে এসেছেন ঠিকিই। তবে সবাই শোকাহত। হৃদয়বিদারক এই ঘটনা ছুঁয়ে গেছে সবার হৃদয়।

নিহত ১৪ জনের মধ্যে মোংলায় ৯ জনের ও কয়রায় চার জনের মরদেহ নেওয়া হয়ে। আর রামপালে নেওয়া হয় মাইক্রোবাস চালকের মরদেহ। শুক্রবার জানাজা শেষে সবার লাশ দাফন সম্পন্ন হয়েছে।

মোংলার আব্দুর রাজ্জাকের পাঁচ ছেলে ও এক মেয়ে। তার জীবিত তিন ছেলে ও স্ত্রী এবং স্বজনদের কন্ঠে কেবলই আহাজারি। বিয়ে বাড়ির আনন্দ মিলিছে বেদনার সুরে। একসঙ্গে লাশের সারি দেখে নির্বাক হয়ে গেছেন স্বজন-প্রতিবেশীরাও।

রাজ্জাকের আরেক ছেলে আশরাফুল আলম জনি দুর্ঘটনায় স্ত্রী, এক ছেলে ও দুই মেয়ে, দুই ভাই, বাবা ও বোন হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, আমার সব শেষ হয়ে গেছে। আমি তো একা হয়ে গেলাম।

প্রতিবেশী মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, “মরদেহের জানাজা শেষে রাজ্জাকসহ তার নিহত বাকিদের লাশ পৌরসভার সরকারি কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।”

জানাজায় বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম অংশগ্রহণ করেন।

অন্যদিকে শুক্রবার বেলা ১২টার দিকে কনে মিতু তার ছোট বোন লামিয়া আক্তার ও নানি আনোয়ারা বেগমকে নাকসা গ্রামের বাড়ির পাশে কবরস্থানে দাফন করা হয়। আর মিতুর দাদি রাশিদা বেগমকে দাফন করা হয় তার গ্রামের বাড়িতে।

নিহতদের মধ্যে আরেকজন হলেন মাইক্রোবাস চালক নাইম। তার বাড়ি বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার পেড়িখালি ইউনিয়নের সিংগেরবুনিয়া গ্রামে।

এ দুর্ঘটনায় আহত অবস্থায় একজন খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

বর সাব্বির মোংলা শহরে মোবাইলের দোকান চালাতেন। আর কনে মিতু কয়রার নাকসা আলিম মাদ্রাসার আলিম প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।

এমটিআই

বর্তমান সংবাদ

banner
M. J. Holiday Resort
Tasneem Sinha
Link copied!