লালমনিরহাট : লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার চন্দ্রপুর ইউনিয়নের সীমান্তঘেঁষা প্রত্যন্ত এলাকায় নীরবে গড়ে উঠেছে মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত, "চন্দ্রপুর জেএনপিএস বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয়"।
সমাজের অবহেলিত ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শিক্ষা, পরিচর্যা ও আত্মনির্ভরশীল করে তোলার লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি আজ এলাকাবাসীর কাছে আশার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী ২০১৫ সালে মানবিক চিন্তা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে নিজের ২০ শতক জমি বিদ্যালয়ের নামে দান করেন। তার বিশ্বাস ছিল, সমাজের প্রতিটি শিশুরই শিক্ষা, স্নেহ ও মর্যাদা পাওয়ার সমান অধিকার রয়েছে। সেই স্বপ্ন থেকেই যাত্রা শুরু হয় বিদ্যালয়টির। বর্তমানে এখানে প্রায় ৪০০ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে এবং ৩৫ জন শিক্ষক-কর্মচারী আন্তরিকতার সঙ্গে তাদের শিক্ষা ও পরিচর্যায় নিয়োজিত রয়েছেন।
সরকারি কিংবা বেসরকারি কোনো নিয়মিত আর্থিক সহায়তা না থাকলেও থেমে নেই বিদ্যালয়ের কার্যক্রম। প্রতিষ্ঠাতা ও স্থানীয় শুভানুধ্যায়ীদের সহযোগিতায় নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত হচ্ছে শিক্ষা কার্যক্রম।
প্রতিদিন শিশুদের জন্য পাঠদানের পাশাপাশি শারীরিক ও মানসিক বিকাশমূলক কার্যক্রম, খেলাধুলা, চিত্রাঙ্কন, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং জীবনমুখী দক্ষতা শিক্ষার আয়োজন করা হয়। শিক্ষকরা বিদ্যালয়টিকে শিশুদের জন্য নিরাপদ, স্নেহময় ও আনন্দঘন পরিবেশে পরিণত করতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
একসময় যেসব শিশু ঘরের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ ছিল, তাদের অনেকেই এখন বিদ্যালয়ে এসে বন্ধুদের সঙ্গে মিশছে, গান শিখছে, ছবি আঁকছে এবং নিজ হাতে ছোটখাটো কাজ করতে শিখছে। তাদের আত্মবিশ্বাসও বেড়েছে চোখে পড়ার মতো। অভিভাবকদের ভাষ্য, এই বিদ্যালয় তাদের সন্তানদের জীবনে নতুন আলো এনে দিয়েছে। অনেক শিশু এখন নিজের প্রয়োজনের কথা প্রকাশ করতে পারে, নিয়মিত পড়াশোনা করছে এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডেও অংশ নিচ্ছে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোস্তফা কামাল বলেন, “বিশেষ শিশুদের শিক্ষা শুধু বইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাদের প্রতিভা বিকাশ, আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি এবং সমাজে মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার উপযোগী করে গড়ে তোলাই আমাদের মূল লক্ষ্য। সীমিত সামর্থ্য থাকলেও ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ নিয়ে আমরা শিশুদের পাশে থাকার চেষ্টা করছি।”
বিদ্যালয়টির কার্যক্রম সম্প্রতি স্থানীয় প্রশাসনেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। গত ৯ জুলাই ২০২৬ কালীগঞ্জ উপজেলার ভারপ্রাপ্ত মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মোহাম্মদ বদরুল হাসান এবং ২৭ জুলাই ২০২৬ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ সাইফুল ইসলাম বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করেন।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, সীমান্তবর্তী প্রত্যন্ত এলাকায় এমন উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়। সরকারি সহায়তা, উন্নত অবকাঠামো, প্রশিক্ষিত জনবল এবং প্রয়োজনীয় থেরাপি সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে বিদ্যালয়টি উত্তরাঞ্চলের বিশেষ শিশুদের জন্য একটি আদর্শ মডেল প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। মানবিকতা, ত্যাগ ও সামাজিক দায়বদ্ধতার উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে চন্দ্রপুর জেএনপিএস বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয়।
সকল প্রতিবন্ধকতাকে পেছনে ফেলে বিশেষ শিশুদের স্বপ্নকে ডানা মেলতে সহায়তা করছে এই প্রতিষ্ঠান। সমাজের সামান্য সহযোগিতা এবং রাষ্ট্রের আন্তরিক নজর পেলে এখানকার প্রতিটি শিশুই একদিন প্রমাণ করতে পারবে যে,প্রতিবন্ধকতা নয়, সম্ভাবনাই মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়।
এমটিআই
