১.
‘আধুনিকতা’ একটি বোধ। বিশেষ করে মননভঙ্গি ও গতিশীল দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। মননভঙ্গি ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন সমাজের আভ্যন্তর অবস্থার দ্বিধাদ্বন্দ্বের মানস প্রকৃতিকে কাব্যভাষায় রূপ দান করেন কবি। কবি’র মন যেমন একদিকে বিশ্ববীক্ষা থেকে উপাদান সংগ্রহ করে, অন্যদিকে দেশ ও কালের ঐতিহ্যের নির্যাস তার সৃষ্টিপ্রবণ ধমনীতে রক্তকণিকার মতো সঞ্চারিত হতে থাকে। কবিতার ইতিহাসকে সত্যিকার অর্থেই যদি টেকনিকের ইতিহাস হিসেবে বিবেচ্য হতে দেখি তবে কবিতায় টেকনিকের পরিবর্তন, ভাব থেকে রূপের পরিবর্তন নয় শুধু, সভ্যতার বিশেষ স্তরে, মানসিকতার বিশেষ মুহূর্তে, কাব্যরীতির পরিবর্তন এসব গ্রহণীয়। কাজেই শিল্পের দাবি, ‘আজকের মানুষের কাছে আজকের ভাষায় কথা বলতে হবে।’ আজকের শব্দটি লক্ষণীয় কিন্তু ‘আজ’ এই সূচক ভাবসত্তাটি এসেছে অনতিসরল ইতিহাসের পথেই। এখানে কবি’র সময়চেতনা বিশেষ গুরুত্ব বহন করেন। কবি আজকের কালে সমস্ত কালকে প্রত্যক্ষ করেন, তাঁর মানসপটে বিগত, বর্তমান এবং ভবিষৎ প্রত্যহকে কেন্দ্র করে উপস্থাপিত হয়। কবি’র বোধের অণু-পরমানুতে সামগ্রিকভাবে সময়চেতনা বা ইতিহাসচেতনা জাগ্রত থাকে। সুতরাং আধুনিক কালের জটিল ভাবনা ও চিন্তার সঙ্গে বোঝাপড়া না করে উপায় নেই, পাঠকেরও আধুনিকতার সারৎসার আত্মস্থ করার প্রস্তুতি আবশ্যিক। প্রাচীন কাব্যের মূলসূত্র আত্মবিলুপ্তি এবং পরবর্তী কবিতার উপপাদ্য অভিমানী অহং। এই প্রভেদ বাংলা আধুনিক কবিতার চরিত্র ও মাত্রা সংক্রান্ত আলোচনায় মধুসূদন-পূর্ব অধ্যায়ের প্রবেশাধিকার অস্বাভাবিক কিছু নয়।
২.
‘আধুনিক’ শব্দটি প্রথম উচ্চারণ করেছিলেন, রঙ্গলাল বন্দোপাধ্যায়। যতটুকু জানা যায়, অন্তত ১১৭০ খ্রিস্টাব্দ থেকে আজ পর্যন্ত নিরন্তর সকল যুগের কবিদল নিজেদের আধুনিক বলে অভিহিত করে আসছেন। তাই, আধুনিকতার স্বরূপ সন্ধান দায় এখনো আরদ্ধ একটি কাজ। আধুনিক কবিতার জন্ম হয়েছিলো ইয়োরোপে। প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সময়কালে ক্রমান্বয়ে ভাঙনের পথে তার আবির্ভাব। রুশ বিপ্লব, ঊনত্রিশ সালের অর্থনৈতিক বিপর্যয়, শক্তিবাদ ও ফ্যাসিবাদের অভ্যূত্থান, স্পেনে গৃহযুদ্ধ এসবঘটনাবলী কবি সম্প্রদায়ের পক্ষে উদাসীন থাকা সম্ভব ছিলো না। রুশ বিপ্লবের বিজয়র সূত্র ধরে মার্কসবাদ ও ফ্রয়েডীয় তত্ত্ব পুরোনো ধ্যান ধারণা পাল্টে দিতে শুরু করে। এভাবেই বিশ্বসাহিত্যে কবিতায় আধুনিকতার যাত্রা শুরু হয়েছিলো। বিশ্বসাহিত্যের এই ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে আধুনিকতার অভিযাত্রা ভারতবর্ষেও এসে লেগেছিলো। এখানেও অসহযোগ আন্দোলন, শিল্পবিস্তার, অর্থনৈতিক বিপর্যয়, বেকার সমস্যা সবকিছুই অনুভূতিপ্রবণ তরুণ কবিদের চোখের সামনে ঘটেছিলো। এ থেকে অনুমান করা যেতে পারে, আধুনিক বাংলা কবিতা প্রতিধ্বনিমাত্র নয়। আধুনিক কবি’রা বিশ্বনাগরিক। এজন্যে বলা হয়ে থাকে, ‘আধুনিক কবিমাত্রই স্বভাবে-উদ্বাস্তু, স্বদেশেও সে প্রবাসী।’ ১৯১৪ থেকে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দ সময়কাল সমগ্র পৃথিবীর পক্ষে একটা প্রচণ্ড ভাঙাগড়ার যুগ। রাষ্ট্র, সমাজ এবং অর্থনৈতিকভিত্তি অতি দ্রুত পরিবর্তিত হয়েছিলো। মানুষের জীবনদর্শন ও মূল্যবোধ সম্বন্ধে প্রাক্তন ধারণা ও বিশ্বাস ভেঙে পড়তে শুরু হয়েছিলো। যদিও এই পরিবর্তন আরাম্ভ হয়েছিলো ইউরোপে, তার আকৃতি ও প্রকৃতি প্রথমে খুব স্পষ্ট ছিলো না। বাংলা কবিতায় তার ঢেউ এসে লেগেছিলো আরো পরে। বলা হয়ে থাকে, বিশ শতকের ত্রিশের দশক প্রকৃতপক্ষে বাংলা আধুনিক কবিতার ‘প্রথম দশক।’ এই দশকে যারা আধুনিক বাংলা কবিতার প্রতিষ্ঠাতা পিতৃপুরুষ তাদেরই কণ্ঠস্বর শোনা যায় প্রথম। যদিও কল্লোল যুগের কবিরা মনে করতেন- ‘মোহিতলালকে আমরা আধুনিকতার পুরোধা মনে করতাম।’ তিনিই ছিলেন কল্লোল যুগের কবিদের কাছে আধুনিকোত্তম। আধুনিকতা যে অর্থে বলিষ্ঠতা, সত্যভাষিতা বা সংস্কারসাহিত্য তা আমরা খুঁজে পেয়েছিলাম তার কবিতায়।’ আধুনিক শব্দটিকে আপেক্ষিক হিসেবেও দেখা হয়ে থাকে। কাজেই লক্ষণীয়, মাইকেল মধুসূদন কিংবা রবীন্দ্রনাথও আধুনিক ছিলেন একদা। আবু সয়ীদ আইয়ুব তার আধুনিক কবিতা-সংকলনে বলেছেন- ‘কালের দিক থেকে মহাযুদ্ধ-পরবর্তী, এবং ভাবের দিকে থেকে রবীন্দ্র-প্রভাবমুক্ত, অন্তত মুক্তিপ্রয়াসী কাব্যকেই আমরা আধুনিক কাব্য বলে গণ্য করেছি।’ জীবনানন্দ দাশের মতে, বাংলা কবিতায় বা কোনো দেশেরই বিশিষ্ট কবিতায় আধুনিকতা শুধু আজকের কবিতায় আছে- অন্যত্র নয়, একথা ঠিক নয়। শুধু সময়ের দিক থেকে আধুনিক হলে আধুনিক কবিতা হয় না।’ রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন- ‘কাজটা সহজ নয়। কারণ পাঁজি মিলিয়ে মর্ডানের সীমানা নির্ণয় করবে কে?’ তার মতে, নদী যেমন বাঁক নেয় সাহিত্যেও তেমনি গতি বদলায়। সেই বাঁকটাকেই বলতে হবে মর্ডান। বাংলায় বলা যাক আধুনিক। এই আধুনিকতা সময় নিয়ে নয়, মর্জি নিয়ে।’ এই মর্জি হলো ইচ্ছে। অর্থাৎ মানুষের ইচ্ছাশক্তি। বুদ্ধদেব বসু বলেছেন- ‘এই আধুনিক কবিতা এমন কোনো পদার্থ নয় যাকে কোনো একটা চিহ্ন দ্বারা অবিকলভাবে সনাক্ত করা যায়। একে বলা যেতে পারে বিদ্রোহের, প্রতিবাদের কবিতা, সংশয়ের, ক্লান্তির, সন্ধানের আবার এরই মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে বিস্ময়ের জাগরণ, জীবনের আনন্দ, বিশ্ববিধানে আস্থাবান চিত্তবৃত্তি। আশা আর নৈরাশ্য, অন্তর্মুখিতা বা বহির্মুখিতা, সামাজিক জীবনের সংগ্রাম আর আত্মিক জীবনের তৃষ্ণা এই সবগুলো ধারাই খুঁজে পাওয়া যাবে শুধু ভিন্ন-ভিন্ন কবিতে নয়, কখনো হয়তো বিভিন্ন সময়ে একই কবি’র রচনায়।
৩.
আধুনিক বাংলা কবিতার স্বরূপ উদ্ঘাটন করার ক্ষেত্রে বলা হয়ে থাকে আধুনিক বাংলা কবিতা মিশ্র সংস্কৃতির উপাসক। পারিপার্শ্বিক যন্ত্রসভ্যতার অনেক আবিলতা এসে তাকে ঘোলাটে করেছে, কিন্তু তার প্রার্থনা সমুদ্রসংগম। এই সর্বগ্রাসী অন্বেষাই আধুনিক কবিতার মূল সুর। অবশ্য, ভাবের আধুনিকতা যে প্রধানত আমদানি করা পণ্য নির্ভর, তার প্রমাণ তখনকার প্যারডি প্রবণতা কবিতাগুলো। একটা সময় ভাবের আধুনিকতা, পক্ষান্তরে রূপের আধুনিকতা উপাস্য হয়ে উঠেছিলো। রবীন্দ্রনাথ অতীতপরায়ন ছিলেন না। বাংলা কবিতায় রবীন্দ্রনাথ সেই কনকাচল, আধুনিক কবিরা যাকে একদিন সজোরে পরিত্যাগ করে এসেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ তার শেষ দশকের দিকে নিজেই নিজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন। অর্থাৎ আধুনিকতার আন্দোলনে তিনিই প্রথম সেই পাখি, যাকে নিশ্চিন্ত ও প্রতিষ্ঠিত শেষাদ্রি পরিহার করতে হয়েছিলো। রবীন্দ্রনাথের অন্তিম সময়ের কবিতার আদ্যোপান্ত পাঠ আমাদের সেই স্বাক্ষ্যই বহন করায়। তৎকালীন আধুনিক কবিদের কাছে তিনি প্রথমে ‘আধুনিক’ হয়ে উঠেছিলেন তার ‘পুনশ্চ’ কাব্যের সূত্রে। কাজেই রবীন্দ্রনাথের কাব্যধর্মকে তার ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিতে দেখা প্রয়োজন। কারণ আধুনিক কবিদের বিদ্রোহ রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে নয়, রোম্যান্টিকতার বিরুদ্ধে। যেহেতু রবীন্দ্রনাথ রোম্যান্টিক দৃষ্টিভঙ্গির আদর্শ প্রতিভূ, আধুনিক কবিরা সেহেতু রবীন্দ্রদ্রোহী। রবীন্দ্রনাথ তরুণ বয়সে ইংরেজ কবিদের দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে শেলি, কীটস, ওয়ার্ডসওয়ার্থ প্রভৃতি প্রত্যেকের কাব্যরচনার মূল সুর ছিলো ইমজিনেশন। জীবনানন্দ দাশ যাকে বলেছেন- ‘কল্পনা প্রতিভা বা ভাবপ্রতিভা।’ ইংরেজি রোম্যান্টিক কবিতার আন্দোলন শুরু হবার প্রায় শতাব্দী পরে রবীন্দ্রনাথের জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর বাল্যকালের পরিবেশে মাইকেল বা ঈশ্বর গুপ্ত বিরাজ করলেও বৈষ্ণবপদাবলী, বিহারীলাল এবং শেলি, কীট্স, ওয়ার্ডসওয়ার্থ প্রভৃতি রোম্যান্টিক কবিরাই তাকে আকর্ষণ করেছিলেন। কেননা রবীন্দ্রনাথ ছিলেন একজন রোম্যান্টিক মানসের অধিকারী। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি রোম্যান্টিকতার প্রতি আনুগত্য থেকেছেন। আধুনিক কবিতার মধ্যে রবীন্দ্রনাথ দেখেছিলেন ক্ল্যাসিকাল সদগুণ। এর মধ্যে তিনি দেখেছিলেন ‘সুনিশ্চিত আত্মতা’ ইংরেজিতে যাকে বলে ক্যারেকটার। রোম্যান্টিক কবিতার যুগের সাথে আধুনিক কবিতার পার্থক্য নিরূপনের ক্ষেত্রে তিনি লিখলেন- ‘কাব্যে বিষয়ীর আত্মতা ছিলো উনিশ শতব্দীতে, বিশ শতাব্দীতে বিষয়ের আত্মতা।’ ক্যারেকটার, নিরাসক্তি, বিষয়ের আত্মতা বা অবজেক্টিভিটি। বিষয়ের উপস্থাপনায় অবৈকল্য ও অকপটতা এইসবই ক্লাসিকাল গুণ।
৪.
আধুনিক কবিতার প্রথম ও প্রধান লক্ষণ হয়ে ওঠে দুবোর্ধ্যতা। কিন্তু আধুনিক কবিতা দুরূহ হলেও দুবোর্ধ্য নয়। আমাদের মনে রাখতে হবে, দুবোর্ধ্যতা ও আধুনিকতা সমার্থক নয় এবং আধুনিক কবিতার সঙ্গে দুবোর্ধ্যতার সম্পর্ক সর্বদেশ সর্বকালে নিবিড় নয়। আধুনিকতার সঙ্গে অঙ্গাঅঙ্গী সম্পর্কে বিজড়িত জীবনের সারাৎসার, সমাজের পরিবর্তমানতা, সযত্ন বিশ্বস্ততার মধ্যে পরানিষ্ঠা। যদিও প্রত্যেক যুগেই সত্যকার মৌলিক সৃষ্টি সাধারণের কাছে অদ্ভুত মনে হয়। অধিকাংশ মহৎ রচনার জন্যে পাঠকগোষ্ঠি সৃষ্টি করতে সময়ের প্রয়োজন হয়েছে। মূলত, যুগের জীবন অতি জটিল এবং অতি ব্যাপক বলে আধুনিক কবি’র প্রকাশভঙ্গি দুরূহ হয়ে উঠেছিলো। এই দুরূহতা আধুনিক যুগমানসেরই প্রতিবিম্ব। বিশেষ করে আধুনিক কবি’রা চেয়েছিলেন, পাঠক সাধারণকে তাদের জটিল অভিজ্ঞতার অংশীদার করতে। এ প্রসঙ্গে আধুনিক কবি জীবনানন্দ দাশ এর উক্তিটি উল্লেখ করা যেতে পারে- ‘ভিড়ের হৃদয় পরিবর্তিত হওয়া দরকার।’ অবশ্য সুধীন্দ্রনাথ দত্ত বলেছেন- ‘যে দুরূহতার জন্ম পাঠকের আলস্যে, তার জন্যে কবি’র উপরে দোষারোপ করা অন্যায়।’ দুরূহতার অভিযোগ রবীন্দ্রনাথকেও সহ্য করতে হয়েছে- ‘অস্পষ্টতা’- নামে। একই দুরূহতার অভিযোগ তিরিশের আধুনিক কবিদের সহ্য করতে হয়েছে ‘দুবোর্ধ্যতা’ নামে। সাহিত্য বিচারে দেখা যায়, তিরিশের প্রধান কবিরা প্রায় প্রত্যেকেই রবীন্দ্রসাহিত্যভাণ্ডার লুঠ করেছেন দু’হাতে। প্রতিক্রিয়া এবং আত্মসর্ম্পন এই দুয়ের মধ্যে দিয়েই তাঁরা অগ্রসর হয়েছেন। তাদের বিভিন্ন চিঠিপত্র ও নানা প্রবন্ধে এই অকুণ্ঠ ভক্তিনিবেদন দেখতে পাওয়া যায়। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে- বুদ্ধদেব বসুর কাছে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন- তাঁরই ভাষায়, ‘দেবতার মতো।’ আপনার কাছ থেকে আমি ভাষা পেয়েছি। (চিঠি, দেশ,সাহিত্য সংখ্যা-১৩৮১) এই চিঠিত্ইে বুদ্ধদেব বসু রবীন্দ্রনাথকে শেষে লিখেছেন ‘শতকোটি প্রণাম।’ তিরিশের কবি জীবনানন্দ দাশ, বুদ্ধদেব বসু, অমিয় চক্রবর্তী, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত এবং বিষ্ণু দে নিজেদের স্বাতন্ত্র কবি-ব্যক্তিত্বের যৌথ সমাহারে কবিতা রচনা করেছেন তখনই এই আন্দোলনের সমষ্টিক রূপ- ‘আধুনিক কবিতা।’ তখনই স্থির হয়ে গেলো কাব্যভাষা, প্রসঙ্গ-প্রকরণ রবীন্দ্রসীমানা পার হতে চলেছে। জীবনানন্দ দাশ, রবীন্দ্রনাথ ও আধুনিক বাংলা কবিতা প্রসঙ্গে বলেছেন- ‘প্রত্যেক বিশিষ্ট কবিই তাঁর যুগ ও সমাজ সম্বন্ধে সচেতন থেকে ভাবনা প্রতিভার আশ্রয়ে কবিতা লিখতে চান, তখন তাঁর কবিতার আঙ্গিক ও ভাষা বিচিত্রভাবে সৃষ্টি হয়- এমনই একটা অপরূপ সঙ্গতি পায় যা তাঁর কবিতায়ই সম্ভব। অন্য কারো কবিতার নয়।’ বিষ্ণু দে অবশ্য বলেছেন- কবিতারচনা মাত্রেই আত্মসচেতনতার এক কর্ম। সে হিসেবে আধুনিক কাব্যের বংশপরম্পরা অতিদীর্ঘ।’ ব্যাপ্তি ও বিকাশের পিপাসাই আলোক, আলোকেরই অধিক। কবি তাঁর সময়ের মুখপাত্র। সময়ের পটে তিনিই সবচেয়ে জীবন্ত, সবেচেয়ে সজাগ। এখানেই কবির সত্যবোধ এবং শব্দাগ্রহ অবিচ্ছেদ্য। কবি নিজ নিজ অভিজ্ঞতা সম্বন্ধে সচেতন। কবির স্বাতন্ত্র্য এখানেই যে, তাঁর এই সচেতনতা বা অবধানতাই তাঁর প্রকাশমাধ্যম। কবিতার ভাষা কবি’র অভিজ্ঞতারই ভাষা। রবীন্দ্রনাথের প্রভাব থেকে মুক্তির সমস্যা যেমন তিরিশের আধুনিক কবিদের চিন্তিত করেছিল, তেমনি তিশের কবিদের কাব্যবিপ্লবেও রবীন্দ্রনাথ কম চিন্তিত ছিলেন না।
৫.
আধুনিক কবিতা বিচারের ক্ষেত্রে প্রথমে প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা এবং এই সংজ্ঞা নির্ণায়কের জন্যে পদ্ধতি নির্ণয় একান্ত প্রয়োজনের কথা বলেছেন ধ্রুবকমুার মুখোপাধ্যায়। কেননা আধুনিক কবিতার একটি যথাযথ এবং সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞার মাধ্যমে তাঁর কালবিচার, বৈশিষ্ট্য, রূপকল্প এবং ভাবধারা প্রভৃতি উন্মোচিত হবার সুযোগ ঘটবে। কিন্তু আধুনিক কবিতার সংজ্ঞা নির্ণীত না হলেও আধুনিক কবিতার ভাবগত এবং ভাবগত পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শৈলী-প্রকরণের বা আঙ্গিকগত যেসকল নানাবিধ লক্ষণগুলো উল্লেখিত আছে দীপ্তি ত্রিপাঠীর আধুনিক বাংলা কাব্যপরিচয় গ্রন্থে সেই লক্ষণগুলো থেকেই আমরা আধুনিক বাংলা কবিতার একটা স্বরূপ পরিচয় পেয়েছি বলা যেতে পারে। কেননা তিরিশের কবিদের কবিতায় যে আধুনিকতা দীপ্তি ত্রিপাঠীর উল্লেখিত আধুনিক বাংলা কবিতার লক্ষণগুলো তিরিশের কবিদেরই নির্মিত কবিতা থেকে চিহ্নিত রূপের একটি ফলশ্রুতিরূপ। তিরিশোত্তো কবিদের কবিতায় যে আধুনিকতার স্পর্শ দেখা মিলে বাংলা আধুনিক কবিতার ধারাবাহিকতায় বলা যেতে পারে সাম্প্রতিক কিংবা সমকালের বাংলা কবিতাতেও কিছু ব্যক্রিতম বাদে অনুরূপ সেইসকল লক্ষণগুলো প্রতিফলিত হতে দেখা যায়। পরিশেষে বলা যেতে পারে, সাহিত্যের শেষ মূল্য আনন্দ। ‘সুন্দর আনন্দ দেয় তাই সাহিত্যে সুন্দরকে নিয়ে কারবার।’ কবিতাসৃষ্টির তত্ত্ব তাই- ‘রূপের দ্বারাই অপরূপকে প্রকাশ করা, অপরূপের দ্বারা রূপকে আচ্ছন্ন করে দেখা।’ অর্থাৎ inside থেকে outside এবং outside থেকে inside- এ দেখা। বুদ্ধদেব বসু ‘কালের পুতুল’ প্রবন্ধ গ্রন্থে বলেছেন- ‘আধুনিক কথাটার সংজ্ঞার্থ যুগে যুগে বদলায়, অভিনবত্বের আকর্ষণ ক্ষণস্থায়ী, এবং সর্বশেষ বিচারে বোধহয় একথাই বলতে হয় যে, সেটাই সত্যকার আধুনিকতা, যেটা চিরন্তন।’ যিনি আধুনিক কালের মানুষ এবং যার রচনায় আধুনিক পরিস্থিতি তার জটিলময় সমগ্রতা নিয়ে পরিপূর্ণ মর্যাদায় প্রতিবিম্বিত হয়েছে, আধুনিক কালকে যিনি উপলব্ধি করেছেন এবং সেই উপলব্ধিকে যিনি তাৎপর্যময়ভাবে প্রকাশ করতে পেরেছেন তিনিই আধুনিক।’ কবিতার আধুনিকতা নির্ণীত হবে কবিতার ঝোঁকের দিকে নজর রেখে। আধুনিকতা শব্দটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সামগ্রিক অভিধাবাচক, সভ্যতার স্তর পরিবর্তিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশগত এবং ভাবগত স্তর পরিবর্তিত হয়, এই পরিবর্তিমানতার চিহ্ন অঙ্গে ধারণ করাই হলো কবিতার আধুনিকতা। যেখানে বিষয়গত এবং রূপগত উভয় দিকের প্রতি নির্দেশ থাকবে। আধুনিকতা কোন স্বয়ম্ভু ব্যাপার নয়, জীবনের অপার উৎসারণ। যদি কেউ আধুনিকতাকে নিরর্থক শব্দবাহিতা মনে করেন, তবে তিনি শব্দজীবী, শূন্যজীবী নিরর্থক জীবনদর্শনে বিশ্বাসী। আধুনিকতা বির্তকিত ও উপলব্ধ, অনুভবনীয় অথচ অনিবর্চনীয়। আধুনিক কবিতার বক্তব্য, মতামত ও উপস্থাপনায় ভিন্ন-ভিন্ন চারিত্র্য, ভিন্ন ব্যক্তিস্বরূপের উন্মোচন। তাই বলা যেতে পারে, আধুনিক বাংলা কবিতা কোন বিচ্ছিন্ন বস্তু নয়; আধুনিক বাংলা কবিতা একটি সামগ্রিক অভিধা এবং এই আধুনিকতা চিরন্তনী।
