সত্যানন্দ দাশ (১৮৬৩–১৯৪২) ছিলেন একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, সমাজসংস্কারক, প্রাবন্ধিক, ব্রাহ্মধর্ম প্রচারক এবং পত্রিকা সম্পাদক।
তিনি শুধু কবি জীবনানন্দ দাশ-এর পিতা নন, বরং উনিশ ও বিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাংলার উদার মানবতাবাদী চিন্তার অন্যতম প্রতিনিধি ছিলেন। তাঁর জীবন ও আদর্শ জীবনানন্দের চিন্তা, সাহিত্য ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
জন্ম ও শিক্ষা : সত্যানন্দ দাশ বরিশালের এক শিক্ষিত ব্রাহ্ম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁদের আদি নিবাস ছিল বিক্রমপুরে বর্তমান মুন্সীগঞ্জ জেলার লৌহজং উপজেলা-র অন্তর্গত গাওপাড়া (বা গুয়াপাড়া) গ্রামে ( বহু বছর আগে গ্রামটি পদ্মা নদীর ভাঙ্গনে তলিয়ে যায় তবে বর্তমানে সেখানে চর জেগে উঠেছে)।সত্যানন্দ দাশ এর পিতা সর্বানন্দ দাশগুপ্ত বরিশালে গিয়ে স্হায়ী বসবাস গড়ে তোলেন।
তিনি উচ্চশিক্ষা লাভের পর শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন এবং বরিশালের শিক্ষাজগতে একজন আদর্শ শিক্ষক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
শিক্ষক ও সমাজসংস্কারক : তিনি বরিশালের ব্রজমোহন স্কুলে শিক্ষকতা করেন। শিক্ষাদানের পাশাপাশি সমাজে কুসংস্কার, সাম্প্রদায়িকতা ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে কাজ করেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের মুক্তির প্রধান পথ হলো শিক্ষা, যুক্তিবাদ এবং মানবসেবা।
'ব্রহ্মবাদী' পত্রিকার সম্পাদক : সত্যানন্দ দাশ ছিলেন ‘ব্রহ্মবাদী’ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা-সম্পাদক। এই পত্রিকার মাধ্যমে তিনি ধর্ম, শিক্ষা, নারী-অধিকার, সামাজিক সংস্কার ও মানবকল্যাণমূলক নানা বিষয়ে প্রবন্ধ লিখতেন এবং জনমত গড়ে তুলতেন।
মানবতাবাদী চিন্তা : তাঁর চিন্তার মূল ভিত্তি ছিল মানুষ। তিনি ধর্মীয় বিভেদের চেয়ে মানুষের কল্যাণকে বেশি গুরুত্ব দিতেন। তাঁর লেখায় শিক্ষা, হাসপাতাল, জনকল্যাণ এবং সামাজিক উন্নয়নের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। তবে প্রায়ই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে উক্তিটি তাঁর নামে প্রচারিত হয়—“মন্দির, মসজিদ ও গির্জা ভেঙে হাসপাতাল ও স্কুল করা হোক”—এর নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক বা প্রকাশিত প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তাই এটিকে সত্যানন্দ দাশের নিশ্চিত উক্তি হিসেবে উল্লেখ করা উচিত নয়।
জীবনানন্দ দাশের ওপর প্রভাব : সত্যানন্দ দাশের উদার, যুক্তিবাদী ও মানবিক পরিবেশেই জীবনানন্দ দাশ বেড়ে ওঠেন। তাঁর মা কুসুমকুমারী দাশ ছিলেন কবি, আর বাবা ছিলেন চিন্তাবিদ ও সমাজসংস্কারক। এই পারিবারিক পরিবেশ জীবনানন্দের সাহিত্যিক মনন, প্রকৃতিপ্রেম, মানবতাবোধ ও স্বাধীন চিন্তার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মূল্যায়ন : সত্যানন্দ দাশকে কেবল একজন কবির পিতা হিসেবে দেখলে তাঁর অবদানকে ছোট করে দেখা হবে। তিনি ছিলেন একজন প্রগতিশীল শিক্ষাবিদ, সমাজচিন্তক ও মানবতাবাদী, যিনি শিক্ষা, যুক্তি ও মানবকল্যাণভিত্তিক সমাজ গঠনের স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাঁর আদর্শ বাংলা সমাজসংস্কারের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
তথ্য সূত্রঃ Banglapedia, Wikipedia এবং The Daily Star
সম্পাদনায়: নাছির উদ্দিন আহমেদ জুয়েল
সম্পাদক ও প্রকাশক, বিক্রমপুর খবর
