ঢাকা : ইংরেজ-শাসিত ভারতে প্রথম ভারতীয় শিক্ষা কমিশন নিযুক্ত হয় বড়লাট রিপন সাহেবের আমলে, ১৮৮২ সালে। সভাপতি উইলিয়াম উইলসন (ডব্লিউ ডব্লিউ) হান্টার (১৮৪০-১৯০০) সাহেবের নামানুসারে এই কমিশন ‘হান্টার কমিশন’ নামেও সমধিক পরিচিত। কমিশনের মূল প্রতিবেদন বা রিপোর্ট এবং গৃহীত কয়েক শত সাক্ষ্যপ্রমাণ দুই বছর পর খণ্ড খণ্ড আকারে প্রকাশ করা হইয়াছিল।
১৮৮৪ সালে ছাপা বঙ্গীয় প্রাদেশিক কমিটির প্রতিবেদনে অন্যান্যের মধ্যে নবাব আবদুল লতিফ খান বাহাদুর (১৮২৮-১৮৯৩) সাহেবের সাক্ষ্যও পাওয়া যায়। প্রকৃত প্রস্তাবে তিনি ছিলেন বাংলাদেশে হান্টার কমিশনের একনম্বর সাক্ষ্যদাতা। আপনকার সাক্ষ্যে আবদুল লতিফ, ১৮৮০-৮১ সালের বঙ্গদেশে জনশিক্ষা বিষয়ক সার্বিক (সরকারি) প্রতিবেদনের দোহাই দিয়া বলিয়াছিলেন, ঐ বছর বাংলা, বিহার আর উড়িষ্যা মিলিয়া মুসলমান জনগণের সর্বমোট সংখ্যা দাঁড়াইয়াছিল ২১ মিলিয়ন (দুই কোটি দশ লাখ); আর প্রদেশের সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া মুসলমান ছাত্রছাত্রীর মোট সংখ্যা ছিল ১৫৬,০৮১ (এক লাখ ছাপ্পান্ন হাজার একাশি)। নবাব আবদুল লতিফ মন্তব্য করিয়াছিলেন ‘এ প্রপোর্শন হুয়িচ স্পিকস ফর ইটসেল্ফ’ অর্থাৎ অনুপাতটা মানে জনসংখ্যার দুই শত দশজনে মাত্র দেড়জন বা শতে একজনের কম কেন তাহা লইয়া মন্তব্য বাহুল্য বৈ নহে।
আজ দেড়শ বছর গত হইতে চলিল, আরেকটা মন্তব্য করিলে আশা করি দোষের হইবে না। বড়লাট উইলিয়াম বেন্টিঙ্কের আমলে নিযুক্ত একেশ্বরবাদী যাজক উইলিয়াম অ্যাডাম সাহেব ১৮৩৫-৩৮ সালের মধ্যে যে জরিপ পরিচালনা করেন, তাহাতে দেখা যায় বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা সম্বলিত বঙ্গদেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল দেড় লাখের মতন। পঞ্চাশ বছর আগে যত বিদ্যালয়ের হদিস পাইলাম, পঞ্চাশ বছর পরে দেখিলাম তত বিদ্যালয়ের খবর নাই। পুরানা সেই দিনের কথা সে কি ভোলা যায়! ১৮৮০-৮১ নাগাদ বিদ্যালয়পিছু একজন করিয়া মুসলমান ছাত্র-ছাত্রী পাওয়া গেল! প্রগতি নিরন্তর।
এই প্রগতিশীল মুসলমান জনসাধারণের মধ্যে শিক্ষাবিস্তারের জন্য নবাব আবদুল লতিফ অনেক চেষ্টাচরিত্র করিয়াছিলেন। সেই চেষ্টার ফল বাংলাদেশে শিক্ষার এখন পর্যন্ত যত অপর্যাপ্ত বিস্তার। সেই বিস্তারের পঞ্চাশ বছর পরেও দেখা গেল বাঙালি মুসলমান জনগোষ্ঠী প্রতিবেশী হিন্দু জনগোষ্ঠীর সঙ্গে শিক্ষাদীক্ষায় আঁটিয়া উঠিতেছে না।
শুড়ির সাক্ষী মাতাল! খোদ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯৩৬ সালে বিলেতে ভারত বিষয়ক পররাষ্ট্র মন্ত্রীবরাবর পাঠাইবার উদ্দেশ্যে লিখিত একপ্রস্ত এজমালি স্মারকলিপি স্বাক্ষর করিয়াছিলেন। লিপিতে লেখা হইয়াছিল : ‘বাংলাদেশের হিন্দু জনগোষ্ঠী, সংখ্যায় লঘু হইলেও সংস্কৃতির বিচারে সকল দিক হইতেই [মুসলমান সমাজের তুলনায়] সেরা। দেশে অক্ষর-পরিচয় আছে এমন মোট জনসংখ্যার শতকরা ৬৪ জনই তাহারা আর স্কুলগামী ছাত্র-ছাত্রীর মধ্যে তাহাদের ভাগ শতকরা ৮০ জনেরও অধিক, ঐদিকে নানাধরনের স্বাধীন বৃত্তি আর ব্যবসায়-বাণিজ্যের পরিমণ্ডলেও তাহাদের আর্থিক-বৈষয়িক দাপট সমান প্রতিভাত...।’ এই স্মারকলিপিটার উপলক্ষ ছিল ১৯৩২ সালে ঘোষিত গোষ্ঠীভিত্তিক রোয়েদাদ আর ১৯৩৫ সালের ভারত সরকার আইন। জনসংখ্যা অনুসারে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভা বা আইন পরিষদের আসন বিন্যাস-বন্টনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাইবার লক্ষ্যে উপরের স্মারকলিপিটি লিখিত হইয়াছিল। ইহার লিপিকররা চাহিয়াছিলেন আইনসভার আসন বরাদ্দ করা হউক স্রেফ জনসংখ্যার নিরিখে নয়, হউক শিক্ষাদীক্ষা পাওয়া জনসংখ্যার মাপে, মানে মেধার ভিত্তিতে। তাহাতে বর্ণহিন্দু সমাজের আসনসংখ্যা বৃদ্ধি পাইবে।
আপনারা এক্ষণে জানিতে চাহিতেছেন ধান ভানিতে কেন এই শিবের গীত? জনশিক্ষার সংকোচন বা বিস্তারের সঙ্গে রাষ্ট্র ও সমাজের বন্ধন কতটা নিবিড়, তাহা মনে না পড়িয়া যায় না বলিয়া এই অবতারণা।
ফরাসি বিপ্লবের কিছুদিন আগে, ১৭৫৮ সালে, মনীষী ক্লদ এলভেশিয়ুস (১৭১৫-১৭৭১) লিখিয়াছিলেন, ‘সকল দেশেই মানুষ গড়ার সাধনা আর সরকার গড়ার ভিত্তির মধ্যে একটা নিবিড় সম্পর্ক আছে। তাই খোদ সরকারের ভিত্তিতে পরিবর্তন না ঘটাইতে পারিলে জনশিক্ষার ক্ষেত্রে বড় কোন পরিবর্তন ঘটানো হয়তো সম্ভব হইবে না।’ এলভেশিয়ুস ছিলেন স্বৈরতান্ত্রিক ফরাশি রাজতন্ত্রের প্রজা। তিনি একা নহেন, তাঁহার পুরোগামী ইংরেজ মনীষী জন লক (১৬৩২-১৭০৪) ক্রমে গত তিন-সাড়ে তিন শত বছরে এয়ুরোপখণ্ডে ঢের মহামতি স্বীকার করিয়াছেন রাষ্ট্র-সংগঠনে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সঙ্গে পর্যায়ক্রমে জনশিক্ষা বিস্তারের (রাষ্ট্রের খরচে সর্বজনীন প্রাথমিক ও বুনিয়াদি শিক্ষা প্রসারের) একটা নিবিড় সম্পর্ক আছে।
আরো সম্পর্ক আছে দেশের আর্থিক সমৃদ্ধি, বিশেষ যন্ত্রতন্ত্রসহ শিল্প-কারখানা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সঙ্গে। অধিক কি! অক্ষর-পরিচয়সহ অন্যূন প্রাথমিক বা বুনিয়াদি শিক্ষার সুযোগ না পাইলে আধুনিক কারখানার কাজে নিযুক্ত হইবার অবকাশ নাই। এখানে বোধ হয় বলিয়া রাখা ভালো, রাষ্ট্রের সঙ্গে শিক্ষা-ব্যবস্থাপনার সম্পর্কটা মোটেও সরাসরি বা আয়নায় ফলিত ছবির মতো নয়, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পরোক্ষ, তবু সংযোগ একটা যে আছে, সে কথা অনস্বীকার্য। যে দেশ যত গণতান্ত্রিক, মানে যে দেশে রাজশক্তি (সার্বভৌম ক্ষমতা) যতটা বেশি সর্বসাধারণের হাতে থাকে আর রাজশক্তির সকল শরিক সমান নাগরিক অধিকার ভোগ করে, সে দেশের জনশিক্ষা ব্যবস্থা ততটা বেশি সর্বজনীন।
একটা সত্য আগেভাগে বলে রাখা দরকার। সংস্কৃতির সংগঠন, বিশেষত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গড়ার ভার সচরাচর রাষ্ট্রের হাতে নয়, সমাজের হাতেই ন্যস্ত থাকে। রাষ্ট্র তাহার সুফল ভোগ করে মাত্র। জনশিক্ষার ভার আমাদের দেশে আজ পর্যন্ত না নিলেন সমাজ, না নিলেন রাষ্ট্র। শিক্ষার আয়োজন না হইল অবৈতনিক, না হইল সর্বজনীন। কেন হইল না, তাহার নির্ণয় শত মনীষীর কাজ। তবে লোকের চোখে শিক্ষাক্ষেত্রে বিরাজমান এই সংকীর্ণতা কিছু প্রমাণ করিবার থাকে তো প্রমাণ করিয়াছে: এ দেশে না সমাজ না রাষ্ট্র কোনটাই গণতান্ত্রিক হয় নাই।
১৯৪৮ সালের ডিসেম্বর মাসে নবগঠিত সম্মিলিত জাতিসংঘ ‘মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণা’ নাম রাখিয়া যে একটা কোমলমতি দলিল গ্রহণ করিয়াছিলেন, তাহার শিক্ষার তিন পর্যায়-১. প্রাথমিক ও বুনিয়াদি, ২. কারিগরি ও বৃত্তিগত, আর ৩. উচ্চ-নির্দেশ করা হইয়াছিল। বলা হইয়াছিল প্রাথমিক শিক্ষা অবশ্যই গ্রহণ করিতে হইবে। আর প্রাথমিক ও বুনিয়াদি শিক্ষা দেওয়া হইবে নিঃখরচায়।
শিক্ষার ‘বুনিয়াদি স্তর’ বলিতে কি বোঝায় তাহা জাতিসংঘ ভাঙিয়া বলেন নাই। কিন্তু দুনিয়ার সকল দেশেই বোঝানো হয় বুনিয়াদি মানে বারো বছরের (ক্বচিৎ কোথায়ও বা বছর এগারো) বিদ্যালয়গমন। পুরানা দিনের ভারতবর্ষে বলা হইত ‘গুরুগৃহে দ্বাদশবর্ষের বিদ্যাভ্যাস’। জাতিসংঘের ঘোষণা এই প্রশ্নে একান্তই নীরব। তাঁহারা শুদ্ধমাত্র বলিয়াছিলেন, ‘শিক্ষালাভের অধিকার সকলেরই আছে। শিক্ষা, অন্তত প্রাথমিক ও বুনিয়াদি স্তর পর্যন্ত, ফ্রি বা নিঃখরচায় দিতে হইবে। প্রাথমিক শিক্ষা দিতে [রাষ্ট্র] বাধ্য থাকিবে।’
ইংরেজি ‘এলিমেন্টারি এজুকেশন শ্যাল বি কম্পালসারি’ বাক্যের প্রচলিত তর্জমা : ‘প্রাথমিক শিক্ষা হইবে বাধ্যতামূলক’। ইহাতে বলা নাই শিক্ষা দিতে কে বাধ্য হইবে। আমরা ধরিয়া লইতে পারি শিক্ষার আয়োজন করিতে বাধ্য কর্তৃপক্ষের নাম রাষ্ট্র। এই দায় সম্মিলিত জনগোষ্ঠীর। এই অনুমান অমূলক নয়, কারণ একই ঘোষণায় জানান দেওয়া আছে : ‘আপন আপন ছেলেমেয়েকে কোন কিসিমের শিক্ষা দেওয়া হইবে, তাহা আগে ঠিক করিবার অধিকার মা-বাবার হাতে ন্যস্ত।’
যাহাকে বাংলা অনুবাদে বলে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ-মাধ্যমিক শিক্ষা, আমাদের খণ্ডে তাহার ব্যাপ্তি বারো বছর। ধরিয়া লইলাম শিশুরা ছয়বছর (কোথায়ও কোথায়ও বা পাঁচবছর) হইতে বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া শুরু করিয়া থাকে। তাহাদের বয়স ১৭/১৮ বছরে পৌঁছানো পর্যন্ত যেটুকুন শিক্ষাদীক্ষা বা ১১/১২ বছর ধরিয়া যে যৎসামান্য বিদ্যাভ্যাস, তাহাই বুনিয়াদি শিক্ষা! জাতিসংঘের নীরব ঘোষণার এই অর্থ যদি আমরা গ্রহণ করি, তাহাকে অযৌক্তিক বলা অন্যায় হইবে।
এক্ষণে এদেশে যে সকল ছাত্র-ছাত্রী বুনিয়াদি শিক্ষা সমাপনের অগ্নিপরীক্ষায় বসিতেছে, তাহাদের সংখ্যা শুনিলাম ১২ লাখের একটু বেশি হইবে। সংখ্যাটা বেশ উৎসাহব্যঞ্জক। আজ হইতে ১৮ বছর আগে যাহারা জন্মগ্রহণ করিয়াছিল, তাহাদের সকলেই বাঁচিয়া আছে এমন নয়। যাহারা বাঁচিয়া আছে তাহাদের শতকরা কতজন এই পর্যন্ত পৌঁছাইয়াছে, জিজ্ঞাসা করিলে আমাদের রাষ্ট্র কতটা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করিয়াছে তাহার একটা মাপ পাওয়া যাইবে।
মনে রাখিতে হইবে আমাদের দেশটার জন্ম ১৯৭১ সালে নয়, ১৯৪৭ সালেও নয়, এমনকি স্যার যদুনাথ সরকার নির্ধারিত ১৭৫৭ সালেও নয়। দেশ বলিতে যদি মাটি আর পানি বুঝাইত, তবে ইহার বয়স আরেকটু বেশি দেখাইত। আর এখানে মানুষজন যাহারা বসবাস করেন তাহারাই যদি দেশ পদবাচ্য হইয়া থাকেন, তো এই দেশের জন্মের পর নিশ্চয়ই কম করিয়া হইলেও কয়েক হাজার বছর পার হইল। পরিবর্তনের মধ্যে শুদ্ধমাত্র রাষ্ট্র আর সমাজ সংগঠন। কেহ বলিবেন তথাস্তু, কেহ বা বলিবেন নাস্তি, নাস্তি, কোন পরিবর্তনই হয় নাই। আমরা দেখিতেছি পরিবর্তন কিছু কিছু যে না হইয়াছে এমন নহে।
এক্ষণে জাতিসংঘ যাহাকে বলেন ‘বুনিয়াদি শিক্ষা’ তাহা আমাদের দেশে দুই নয়, গোটা তিন স্তরে ভাগ করা আছে। এখানে প্রাথমিক স্তর পাঁচ, মাধ্যমিক স্তর পাঁচ, আর উচ্চ-মাধ্যমিক দুই বছরের। অথচ যে সকল দেশের আদর্শ আমরা মান্য করি সে সকল দেশে শিক্ষার প্রাথমিক স্তর কিন্তু পাঁচ বছরের নয়, বরং ছয় বছরের? এই পার্থক্যটা কেন?
যেসব দেশ আমাদের সঙ্গে সঙ্গত কারণে তুলনীয়, যথা জাতীয় বিপ্লবের পরের ভিয়েতনাম, সেখানেও প্রাথমিক স্তরের শিক্ষা ছয় বছরের। অথচ আমাদের দেশে এই স্তরের দৌড় একটি বছর কম। আবারও চিত্ত প্রশ্ন করে, কেন? এই প্রশ্নের সদুত্তর আমরা পাই ক্যাডেট কলেজের স্তরবিন্যাসের দিকে নেত্রপাত করিলে।
আমাদের দেশে মাধ্যমিক স্তরের শুরু হয় ষষ্ঠ শ্রেণি হইতে। কিন্তু উনিশ শত পঞ্চাশের দশকে এবং তাহার পরে প্রবর্তিত সকল ক্যাডেট কলেজে ছাত্রভর্তি করা হয় সপ্তম শ্রেণি হইতে। কেন করা হয়? ক্যাডেট কলেজের শিক্ষাস্তর শেষ হয় দ্বাদশ শ্রেণিতে। যদি বলি ক্যাডেট কলেজে অনুসৃত শিক্ষার স্তরই আদি ও আসল মাধ্যমিক অর্থাৎ বুনিয়াদি স্তর তো বলিতে হয় সারাদেশে মাধ্যমিক ও উচ্চ-মাধ্যমিক স্তর আলাদা করার পেছনে একটা না কারণ আছে।
ইংরেজ শাসনের যুগেও এদেশের শিক্ষার স্তরবিন্যাসে এতটা বৈষম্য কাজ করে নাই, যতটা আজ করিতেছে। অপরাধীন পাকিস্তান যুগের বিন্যাস স্বাধীন বাংলাদেশের যুগেও প্রবল বিক্রমে কাজ করিতেছে। এখনকার ধুরন্ধর বা বুদ্ধিমানগণ বলিতেছেন উচ্চশিক্ষা সকলের জন্য নয়। তাহারা জলদি দেখাইবার লোভ সম্বরণ করিবেন কিনা সন্দেহ, জাতিসংঘের ঘোষণায়ও তো একই কথা বলা হইয়াছিল। জাতিসংঘ অবশ্য বলিয়াছিলেন, “উচ্চশিক্ষায় ‘মেধার ভিত্তিতে’ সকলের প্রবেশাধিকার সমান থাকিবে।” অথচ আমরা কি করিতেছি, প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ-মাধ্যমিক কোন পর্যায়ই তো বাদ রাখি নাই। সর্বত্রই মেধার ভিত্তিতেই প্রতারণার রাজত্ব কায়েম করিয়াছি। যে শিশু বাক্য রচনা করিয়া কথা বলিতেছে তাহার মেধা বুঝি স্বতঃসিদ্ধ নহে!
একদিকে বুনিয়াদি শিক্ষা আরদিকে উচ্চশিক্ষা-এই দুইয়ের মাঝখানে শিক্ষাদীক্ষার আরও একটা স্তর আছে। সেই স্তরের নাম কারিগরি ও বৃত্তিশিক্ষা, ইংরেজি বচনে বলে ‘টেকনিক্যাল অ্যান্ড প্রফেশনাল’ এজুকেশন।
জাতিসংঘের ঘোষণায় বলা হইয়াছিল, ‘কারিগরি আর বৃত্তিশিক্ষা সকলের অধিগম্য করা হইবে।’ এখানে দুইটা জিনিশ চোখে না পড়িয়া যাইতেছে না: কারিগরি আর বৃত্তিশিক্ষার স্তরে ‘মেধার ভিত্তিতে’ কথাটা একেবারেই নাই; কথাটা আছে অন্যত্র, উচ্চশিক্ষার পরিমণ্ডলে।
মানুষ মাত্রেই মেধাবী। মানুষ বাক্যসম্পন্ন বা যুক্তিনশিন প্রাণী। কোন না কোন বৃত্তিশিক্ষার হক তাহার আছে। মেধার ভিত্তিতে কাহাকেও প্রাথমিক কি বুনিয়াদি শিক্ষার অধিকার বঞ্চিত করা হইলে ব্যবস্থারটা নাম আর যাহা হউক গণতন্ত্র হয় না।
জাতিসংঘের ঘোষণায় আরো বলা হইয়াছিল : ‘শিক্ষা পরিচালিত হইবে মানুষের ব্যক্তিস্বরূপের পূর্ণবিকাশ ঘটাইবার এবং মানবাধিকার ও বুনিয়াদি স্বাধীনতার সম্মান পাকাপোক্ত করার জন্য।’ নবম শ্রেণি হইতেই ছাত্র-ছাত্রীদের বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা, মানবিক প্রভৃতি ভাগে ভাগ করার সঙ্গে ব্যক্তিস্বরূপের এই পূর্ণবিকাশের সম্পর্কটা কোথায়! যেসব দেশের আদর্শ আমরা মান্য করি তাহাদের দেশে কি এত আগে এমন স্তরবিন্যাস করা হয়?
বারো বছরের বুনিয়াদ ভাঙিয়া আমরা আট বছরের বুনিয়াদ গড়িয়াছি। আর অভিযোগ করি শিক্ষার মান কমিয়া যাইতেছে! চতুর্থ আর পঞ্চম শিল্পবিপ্লবের যুগে আমরা শিক্ষার ভিত্তি শিথিল হইতে শিথিলতর করিতেছি! পুরাতন পরাধীন দেশের বাহিরে আর কোথায়ও কি এহেন অধোগতির উদাহরণ আছে!
বৃত্তিশিক্ষার হক সকলেরই আছে, তবে বাছিয়া বাছিয়া শ্রমিক শ্রেণির আর নিুবিত্ত শ্রেণির জন্য নিুমানের শিক্ষার এই ব্যবস্থা বা বিধান আদৌ গণতান্ত্রিক নয়। এই নতুন স্বৈরতন্ত্রের আরো বিকাশ ঘটিয়াছে তথাকথিত উপানুষ্ঠানিক বা নন-ফরমাল শিক্ষার ব্যবস্থায়। নগরের বস্তিবাসী বা দুর্গম জনগোষ্ঠীর গ্রামবাসী ছেলেমেয়েদের ব্যক্তিস্বরূপ বিকাশের কথা ছাড়িয়া দিলাম। তাহাদের জন্য চার বছরের বৃত্তিগত শিক্ষাই যথেষ্ট! এই রায় ঘোষণা করিয়া আমরা কি প্রজাতন্ত্রের ভিত্তিতে আঘাত করিতেছি না?
যে মূলনীতি এই চিন্তাধারার জন্ম দিয়াছিল তাহার উৎপত্তি প্রথম মহাযুদ্ধের পর এয়ুরোপ মহাদেশে। তাহার প্রথম আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হইয়াছিল ১৯২৩ সালে, ইতালিতে জাতীয় ফ্যাসিস্ত দল কর্তৃক রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করিবার পর পর গৃহীত শিক্ষানীতিতে। মুসোলিনি সরকারের শিক্ষামন্ত্রী স্বনামধন্য দার্শনিক জোবানি জেন্তিলের নামানুসারে এই নীতির নাম দাঁড়াইয়াছিল ‘জেন্তিলে সংস্কার’। বর্তমানে বিশ্বব্যাংক বেনামি কায়দায় জেন্তিলের সংস্কারের অভিভাবকস্বরূপ সারা দুনিয়ায় এই ফ্যাসিতান্ত্রিক নীতি পুনঃপ্রতিষ্ঠার আয়োজন করিতেছেন। মজার বিষয়, আমাদের কোন শিক্ষাবিদ বা রাজনীতিবিদকে আজ পর্যন্ত প্রশ্ন করিতে দেখি নাই ১৯২০ সালের পরে গৃহীত ইতালির এই ফ্যাসিতান্ত্রিক শিক্ষানীতিটি কোন বিপাকে আমাদের এই গণতন্ত্রের দেশে এতটা আদরের সামগ্রী হইল!
সলিমুল্লাহ খান : অধ্যাপক, ইতিহাস ও দর্শন বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়
(লেখকের বানান ও ভাষারীতি অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে)
