ঢাকা শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

বাংলাদেশের ব্যাটিং-বিভীষিকার পর শরিফুলের বীরত্বে রোমাঞ্চকর দিন

বর্তমান সংবাদ | ক্রীড়া প্রতিবেদক

আগস্ট ২২, ২০২৬, ০৭:০৩ পিএম

বাংলাদেশের ব্যাটিং-বিভীষিকার পর শরিফুলের বীরত্বে রোমাঞ্চকর দিন

ঢাকা : দিনের খেলা তখন শেষের দিকে। ধারাভাষ্যে কেরি ও’কিফ বললেন, “কেউই ভাবতে পারেনি, মিচেল স্টার্কের মতো কিছু করে ফেলবে শরিফুল ইসলাম। যদিও গতি কম, তবে কার্যকারিতায় একই রকম…।” তুমুল জনপ্রিয় এই ধারাভাষ্যকারের কথায় বাড়াবাড়ি নেই একটুও। দিনটি বাংলাদেশের জন্য হতে পারত চরম। সেই দিনটিই লড়াইয়ের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে শরিফুলের সৌজন্যে।

ম্যাকাইয়ের টেস্ট অভিষেকের দিনটি স্মরণীয় করে রাখলেন দুই বাঁহাতি পেসার। ১৮ উইকেটের উথাল-পাথাল দিন শেষে অস্ট্রেলিয়া এগিয়ে অনেকটাই। তবে ব্যাটিং ব্যর্থতার পর লড়াইয়ে ফিরে বাংলাদেশও দিন শেষ করেছে মুখে হাসি নিয়ে।

গ্রেট বেরিয়ার রিফ অ্যারেনার উইকেট ছিল তাজা ঘাস। মিলেছে বাউন্স ও মুভমেন্ট। সেখানে টস হেরে আগে ব্যাটিংয়ে নেমে বাংলাদেশের ইনিংস শেষ ৬৪ রানেই।

রেকর্ডময় বোলিংয়ে প্রথম স্পেলেই ৫টিসহ মোট ৬ উইকেট নিয়ে ব্যাটিং লাইন-আপ কচুকাটা করেন স্টার্ক।

বাংলাদেশের প্রথম ছয় ব্যাটসম্যানের চারজনই ফেরেন শূন্য রানে। দলের সর্বোচ্চ ১৪ রান আসে শেষ ব্যাটসম্যান শরিফুলের ব্যাট থেকে!

এরপর তিনি জ্বলে ওঠেন নিজের আসল কাজে। চোট কাটিয়ে ফেরা পেসার সুইং, মুভমেন্ট ও বাউন্সারের মিশেলে দুর্দান্ত বোলিংয়ে ম্যাচে ফেরান দলকে। আগে ১৩ টেস্টে কখনও ইনিংসে ৩টির বেশি উইকেট পাননি। এবার এক দিনেই তার শিকার ৬ উইকেট।

১১ নম্বরে নেমে দলের সর্বোচ্চ রান এবং বল হাতে ৫ উইকেট শিকারে যুগলবন্দি টেস্ট ক্রিকেটের প্রায় দেড়শ বছরের ইতিহাসেই আর নেই।

অস্ট্রেলিয়া দিন শেষ করে ৮ উইকেটে ১৬৫ রানে।

১০১ রানে এগিয়ে তারা এখন। এই ম্যাচের প্রেক্ষাপটে যা বেশ বড় লিড। তবু বাংলাদেশ জানে, লড়াই থেকে ছিটকে পড়েনি তারা।

সকালে বাংলাদেশের বিপদের শুরু ম্যাচের প্রথম বল থেকেই। স্টার্কের বলে ফ্লিক করার চেষ্টায় গালিতে ধরা পড়েন সাদমান ইসলাম। একাগাদা রেকর্ডের বুদবুদও উড়তে থাকে।

ম্যাচের প্রথম বলেই চারবার উইকেট শিকার করা টেস্ট ইতিহাসের একমাত্র বোলার এখন স্টার্ক। পেরিয়ে গেলেন তিনি সাবেক ক্যারিবিয়ান বাঁহাতি পেসার পেড্রো কলিন্সকে। টেস্টের প্রথম ওভারে ৯ বার উইকেট নিয়ে পেছনে ফেললেন জেমস অ্যান্ডারসনকেও।

টেস্ট ইনিংসের প্রথম বলে স্টার্কের উইকেট হলো এখন পাঁচটি। স্যার রিচার্ড হ্যাডলির রেকর্ড ছুঁতে প্রয়োজন আর স্রেফ একটি। টেস্ট ইনিংসের প্রথম ওভারে সর্বোচ্চ উইকেটে রেকর্ডে অ্যান্ডারসনকে (২৯) ছুঁতেও প্রয়োজন আর একটি উইকেট।

কোনো ভেন্যুর প্রথম টেস্ট বলে উইকেট পতনের চতুর্থ নজির এটি।

শুরুর ধাক্কা সামাল দেওয়ার আগেই টালমাটাল হয়ে পড়ে ইনিংস। স্টার্কের দ্বিতীয় ওভারের প্রথম বলটি আলগা শটে স্লিপে তুলে দেন তানজিদ হাসান। অনায়াসেই ছেড়ে দেওয়া যেত সেই বলটি।

পরের বলে এলবিডব্লিউ নাজমুল হোসেন শান্ত। রিভিউয়ে দেখা যায়, বল কোনোরকমে সামান্য স্পর্শ করছিল লেগ স্টাম্পের বাইরের অংশ। অসন্তুষ্ট বাংলাদেশ অধিনায়ক মাঠ ছাড়েন মাথা নাড়তে নাড়তে।

স্টার্ক ততক্ষণে যেন রক্তের স্বাদ পেয়ে গেছেন। বাংলাদেশ তখন কাঁপছে। সেই ভয়ের বলি মুমিনুল হক। দুটি চার মারতে পারলেও ছেড়ে দেওয়ার বলে ব্যাট পেতে দিয়ে গালিতে ক্যাচ দেন অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান।

স্টার্কের পরের ওভারে স্লিপে সহজতম এক ক্যাচ হাতছাড়া করেন বাউ ওয়েবস্টার। তবে বেঁচে গেলেও টিকতে পারেননি লিটন কুমার দাস। পরের বলেই এলবিডব্লিউ! প্রথম অস্ট্রেলিয়া সফরের দুই ইনিংসেই শূন্যতে ফিরলেন এই কিপার-ব্যাটার।

২২ বলের মধ্যে স্টার্ক পূরণ করে ফেলেন ৫ উইকেট, টেস্ট ইতিহাসে যা ষষ্ঠ দ্রুততম। ১৫ বলে ৫ উইকেট নিয়ে দ্রুততমও তিনিই।

তার প্রথম স্পেলেল চেহারা ছিল অবিশ্বাস্য – ৬-৪-৫-৫!

স্টার্ক আক্রমণ থেকে সরে গেলেও রেহাই মেলেনি বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের। এক প্রান্তে এক ঘণ্টার বেশি সময় লড়াই করে উইকেট আঁকড়ে ছিলেন মুশফিকুর রহিম। তার ৬৯ মিনিটের ইনিংস শেষ হয় কামিন্সের ভেতরে ঢোকা বলে বোল্ড হয়ে (৪২ বলে ৫)।

দলের রান তখন ৬ উইকেটে ২১। চোখ রাঙাচ্ছে টেস্ট ইতিহাসের সর্বনিম্ন স্কোরের শঙ্কা!

সেখান থেকে ১৫ রানের একটি ছোট্ট জুটি দলের জন্য আসে বড় স্বস্তি হয়ে। নিউ জিল্যান্ডের ২৬, ওয়েস্ট ইন্ডিজের ২৭, দক্ষিণ আফ্রিকার ৩০ রানের স্কোরগুলি এই জুটিতে পেরিয়ে যায় বাংলাদেশ। ৬ উইকেটে ৩৫ রান নিয়ে লাঞ্চে যায় বাংলাদেশ।

উইকেটের অবস্থা বুঝে বেশ নির্ভরতায় ব্যাট করছিলেন মেহেদী হাসান মিরাজ। তবে লাঞ্চের পর আর কোনো রান যোগ না করেই ভেঙে যায় মিরাজের প্রতিরোধ (৫১ বলে ১১)।

হাসান মাহমুদকে ফিরিয়ে প্রথম উইকেট পান জশ হেইজেলউড। তবে অস্ট্রেলিয়া, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার ৩৬ রানের স্কোর ততক্ষণে পেরিয়ে যেতে পারে বাংলাদেশ।

নবম উইকেটের পতন হয়ে যায় অবশ্য ৩৯ রানে। দলীয় ফিফটিকে তখন মনে হচ্ছিল অনেক দূরের পথ। শেষ জুটিতে আনন্দময় বিস্ময় উপহার দেন তাইজুল ইসলাম ও শরিফুল। দুজনের ব্যাট থেকে আসে ৫টি বাউন্ডারি। তাইজুলের একটি নান্দনিক স্কয়ার ড্রাইভ দেখে ধারাভাষ্যে অ্যাডাম গিলক্রিস্ট তো বলে ফেললেন, ‘ডেভিড গাওয়ারের মতো…।”

২৫ রানের শেষ জুটি ভেঙে ইনিংস শেষ করেন স্টার্ক। ১২ রানে ৬ উইকেট তার ক্যারিয়ারের তৃতীয় সেরা বোলিং।

কে জানত, দিনের নাটকীয়তার তখনও কত বাকি!

সাড়ে তিন বছর পর ফেরা ম্যাট রেনশকে দ্রুত ফিরিয়ে বাংলাদেশকে প্রথম ব্রেক থ্রু দেন তাসকিন আহমেদ। বিপজ্জনক হয়ে ওঠার আভাস দিচ্ছিলেন ট্রাভিস হেড। প্রথম পরিবর্তন বোলার হিসেবে আক্রমণে এসে দ্বিতীয় বলেই তাকে থামালেন শরিফুল। সিরিজের তিন ইনিংসে তৃতীয়বার প্লেড অন বাঁহাতি এই ওপেনার।

শরিফুলের ওই ওভারেই পায়ের পেছন দিয়ে বোল্ড হয়ে গেলেন ছন্দ পেতে ধুঁকতে থাকা মার্নাস লাবুশেন।

বাংলাদেশ তখন দারুণ উজ্জীবিত। মাঠে তাদের কণ্ঠ ছিল উচ্চকিত। কিন্তু আগের টেস্টের নায়ক হাসান মাহমুদ ছিলেন এ দিন অধারাবাহিক। তাসকিনও পারেননি চাপ ধরে রাখতে। এই সুযোগে স্টিভেন স্মিথ ও ক্যামেরন গ্রিন গড়ে তোলেন জুটি।

এই জুটিতে লিড নিয়ে একশও ছাড়িয়ে যায় অস্ট্রেলিয়া। বাংলাদেশের শরীরী ভাষাও যেন নুইয়ে পড়ছিল। ত্রাতা হয়ে আসেন শরিফুল। ৪২ রান করা স্মিথকে ফিরিয়ে তিনি ভাঙেন ৭৭ রানের জুটি। গোটা দিনে বাংলাদেশের সেরা সময়টি আসে সেখান থেকেই। ৩০ রানের মধ্যে অস্ট্রেলিয়া হারায় ৫ উইকেট।

বাঁহাতি অ্যালেক্স কেয়ারি ক্রিজে আসতেই মিরাজকে আক্রমণে আনেন অধিনায়ক। এই অফ স্পিনারের প্রথম ওভারেই ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে শট খেলতে গিয়ে আউট হন ৫০তম টেস্ট খেলতে নামা কিপার-ব্যাটার।

এরপর শরিফুল-শো। দারুণ ডেলিভারিতে বাউ ওয়েবস্টারকে এলবিডব্লিউ করার পর ওই ওভারেই বাউন্সারে চমকে দিয়ে আউট করেন কামিন্সকে। পরের ওভারে বোল্ড করে দেন স্টার্ককে।

তার বাউন্সারে চমকে গিয়ে ক্যাচ দিয়েছিলেন গ্রিনও। কিন্তু সময়মতো বলের নিচে যেতে পারেননি হাসান। সেই গ্রিন দিন শেষে অপরাজিত ৫১ রানে। ন্যাথান লায়নের সঙ্গে তার ১৭ রানের জুটিতে এ দিন আর অলআউট হয়নি অস্ট্রেলিয়া।

দিনের শেষে ধারাভাষ্যে মাইক হাসির কণ্ঠে ফুটে উঠল গোটা দিনের সারমর্ম, "অস্ট্রেলিয়া অনেকটাই এগিয়ে, তবে হতাশ হবে তারা বাংলাদেশকে ম্যাচ থেকে ছিটকে দিতে না পেরে। ব্যাটিং ব্যর্থতার পরও খুশিমনেই মাঠ ছাড়বে বাংলাদেশ।"

সংক্ষিপ্ত স্কোর:

বাংলাদেশ ১ম ইনিংস: ৩৪ ওভারে ৬৪ (সাদমান ০, তানজিদ ০, মুমিনুল ৯, শান্ত ০, মুশফিক ৫, লিটন ০, মিরাজ ১১, হাসান ১০, তাইজুল ১১*, তাসকিন ১, শরিফুল ১৪; স্টার্ক ১০-৬-১২-৬, হেইজেলউড ১১-২-১৮-১, কামিন্স ১০-৪-২৫-৩, ওয়েবস্টার ৩-০-৮-০)।

অস্ট্রেলিয়া ১ম ইনিংস: ৪০ ওভারে ১৬৫/৮ (হেড ২২, রেনশ ৮, লাবুশেন ৪, স্মিথ ৪২, গ্রিন ৫১*, কেয়ারি ৫, ওয়েবস্টার ০, কামিন্স ০, স্টার্ক ১, লায়ন ১০*; তাসকিন ১১-১-৪১-১, হাসান ১২-৩-৫৬-০, শরিফুল ১১-২-৩৫-৬, তাইজুল ৫-০-১৩-০, মিরাজ ১-০-৪-১)।

এমটিআই

বর্তমান সংবাদ

banner
M. J. Holiday Resort
Tasneem Sinha
Link copied!