ঢাকা : নানা আলোচনা-পর্যালোচনা, পত্রপত্রিকায় নানা পূর্বাভাস আর ফেসবুক নামের বিভ্রান্তি ছড়ানোর মাধ্যমটিতে উড়ো খবরের অবসান ঘটেছে শেষ পর্যন্ত। গত ২১ আগস্ট দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিয়েছেন প্রথিতযশা রাজনীতিবিদ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আমাদের প্রিয় আলমগীর ভাই। তিনি এখন বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি। আমার ভালো লাগার কারণটি হলো, মার্জিত রুচির এই রাজনীতিবিদের সঙ্গে আমার পরিচয় রয়েছে এবং একসময় তা ঘনিষ্ঠতায় পৌঁছেছিল। পরিচয় এখনও আছে, তবে ঘনিষ্ঠতা আর আগের মতো নেই। দুজনের রাজনৈতিক অবস্থানের ভিন্নতা এর কারণ। মির্জা আলমগীর ভাই বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতা এবং সে দল কর্তৃক মনোনীত হয়ে এখন রাষ্ট্রপতি, আর আমি দলীয় রাজনীতির বাইরে থাকা এক শুভাকাঙ্ক্ষী-সমালোচক। যদিও আমার সমালোচনাকে বিএনপির কতিপয় পণ্ডিত শত্রুতা বলেই মনে করে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে আমার পরিচয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। ২০০১-০৬ মেয়াদে দেশনেত্রী খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে আমি তার সহকারী প্রেস সচিব ছিলাম। প্রেস সচিব ছিলেন তথ্য ক্যাডারের কর্মকর্তা অতিরিক্ত সচিব তাজুল ইসলাম। তিনি এবং মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর (তখন প্রতিমন্ত্রী) বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ‘তুই-তুকারি’ সম্পর্ক তাদের। তাজুল সাহেবের কক্ষে তিনি মাঝেমধ্যেই আসতেন। সেখানেই পরিচয়। সদালাপী এবং নিরহংকার এই নিপাট ভদ্রলোককে প্রথম দর্শনেই আমার ভালো লেগে যায়। একসময় আমরাও ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়ি। রাজনীতির সদর-অন্দরের অনেক কথাই শেয়ার করতেন তিনি আমাদের সঙ্গে। ভালো লাগত বাংলাদেশের রাজনীতির বিদ্যমান বাস্তবতা সম্বন্ধে তার গভীর উপলব্ধি ও বিবেচনাবোধ দেখে।
২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারি হওয়ার পর আমরা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি। পরে আমাদের দেখা হতো ধানমন্ডিতে তাজুল সাহেবের বাসায়। তাছাড়া লালমাটিয়ায় তাজুল সাহেবের এক সুহৃদ ইয়াসিন আমিন ভাইয়ের বাণিজ্যিক অফিসেও দেখা হতো। তাজুল সাহেবই আমাকে সেখানে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে মির্জা আলমগীর ভাই আসতেন। আরও আসতেন সাবেক সচিব ও রাষ্ট্রদূত সাবিহ উদ্দিন আহমদ, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ওয়ালিউর রহমান আপেল ভাই। চুটিয়ে আড্ডা চলত সেখানে। আরও একটি আড্ডাস্থল ছিল ধানমন্ডিতে সাবেক সচিব হান্নান সাহেবের বাসায়। কবি নজরুল ইনস্টিটিউটের পাশের ওই বাসাটিতে প্রতি শনিবার বসত রিটায়ার্ডদের নির্মল আড্ডা। বয়োকনিষ্ঠ হলেও সেখানে আমার প্রবেশাধিকার ছিল। তাজুল সাহেবরা সেটার নাম দিয়েছিলেন ‘শনির আড্ডা’। একদিন বললাম, আপনারা এই আড্ডার নাম দিয়েছেন শনির আড্ডা। কিন্তু এখানে তো কারও শনি ঘটানোর বিষয়ে কোনো শলাপরামর্শ হয় না। রসিক ইয়াসিন আমিন ভাই বললেন, ‘কেন, আমরা যে শেখ হাসিনার মুণ্ডুপাত করি, সেটা কি ওই ‘মালিকা-ই-তাহুতি’র শনি ঘটানোর ‘নীলনকশা নয়?’ এমনই গল্পের আসরে মির্জা আলমগীর ভাই মাঝেমধ্যে আসতেন। তখন তিনি বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে প্রচণ্ড ব্যস্ত। ফলে আগের মতো আর হাজিরা দিতে পারতেন না। হঠাৎ হঠাৎ তাজুল সাহেব ফোন করে বলতেন, ‘মোহন, অমুক দিন ফ্রি আছ নাকি? ‘সিনিয়র ভাই’ আমার বাসায় আসবেন।’ সিনিয়র ভাই মানে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। লুফে নিতাম সে দাওয়াত। তাজুল সাহেবের বাসার ড্রয়িং রুমে চলত আড্ডা। শেষ হতো ভাবির আয়োজনে মধ্যাহ্ন ভোজ দিয়ে। এভাবে কতদিন এক সঙ্গে বসেছি, খেয়েছি, তার হিসাব নেই। এভাবে রাজনৈতিক সম্পর্ক কখন যে পারিবারিক সম্পর্কে গড়িয়েছে টেরই পাইনি। আলমগীর ভাইর বড় মেয়ে শামারোহ মির্জার বিয়ের দাওয়াত পেয়ে উপস্থিত হয়েছিলাম। আমার ছেলে ইশতিয়াক সুলতান মেননের সুন্নাতে খতনার অনুষ্ঠানে আমার গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলেন তিনি। এসেছিলেন আমার মেয়ে ফাহমিদা খান মৌরীর এনগেজমেন্ট অনুষ্ঠানেও।
ওয়ান-ইলেভেনের কঠিন সময়ে বিএনপি ও জিয়া পরিবারের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া কর্মীদের মধ্যে আমিও ছিলাম। মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের সঙ্গে বলা যায় ছায়ার মতো ছিলাম। ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ম্যাডাম খালেদা জিয়া ফখরুদ্দীন-মইন উর জিন্দানখানা থেকে মুক্তি পাবার পর দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের দপ্তরে কাজ করতে থাকি। কাজের সুবিধার্থে একপর্যায়ে আমাকে সহ-প্রচার সম্পাদক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু ২০০৯ সালের কাউন্সিল অধিবেশনের পরে গঠিত কমিটিতে আমার স্থান হলো না। কেন হলো না বা কোন কারণে আমি বাদ পড়েছিলাম তা আর এখন বলে লাভ নেই। ওই কাউন্সিল অধিবেশনে আলমগীর ভাই সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হওয়ার পর মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের সঙ্গে তার কেন যেন দূরত্ব ঘুচছিল না। দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে কৃষক দলের অফিসে বসে একদিন আমাকে বললেন, ‘মোহন, মহাসচিব সাহেবের সঙ্গে আমার বসার ব্যবস্থা করে দিন।’ পরদিনই সে বৈঠকের ব্যবস্থা করেছিলাম। দেলোয়ার ভাইর সঙ্গে কথা বলে বুঝলাম, মির্জা আলমগীর সম্পর্কে ভুল ধারণায় ভুগছেন তিনি। বসার কথা বলতেই মহাসচিব বললেন, ‘তিনি তো বড় বাড়ির মানুষ। আমার সাথে বসার কি দরকার আছে?’ মহাসচিবের কথার মর্মার্থ বুঝতে পেরে আমি তাকে বললাম, ‘ভাই, আলমগীর সাহেব আপনার সাবেক রাজনৈতিক কলিগ মির্জা রুহুল আমিনের ছেলে। সে হিসেবে তিনি তো আপনার ভাতিজা। তার সঙ্গে তো আপনার কোনো দূরত্ব থাকা ঠিক না। তাছাড়া দল সামলাতে তার মতো একজন সহকর্মীও তো আপনার দরকার।’ কনভিন্সড হয়েছিলেন দেলোয়ার ভাই।
পরদিন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে নিয়ে মহাসচিবের কক্ষে প্রবেশ করে বললাম, ‘আপনারা চাচা-ভাতিজা কথা বলেন, আমি আমার কাজে যাই।’ ঘণ্টাখানেক পরে আলমগীর ভাই ফোন করলে আমি কৃষক দলের অফিসে যাই। হাস্যোজ্জ্বল আলমগীর ভাই বললেন, ‘ধন্যবাদ মোহন। একটি বড় সমস্যার সমাধানে আপনি আমাকে সাহায্য করলেন।’ তাকে বলেছিলাম, ‘ধন্যবাদ পাবার জন্য আমি কাজটি করিনি ভাই। করেছি আমার দলের স্বার্থে। আপনাদের দুজনের মাঝে দূরত্ব সৃষ্টি হলে দল ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সেটা করে যে বা যারা নিজেদের ফায়দা লুটার পরিকল্পনা করছিল, আজকের পর তাদের পরিকল্পনার ‘পরি’ নিশ্চয়ই দূর আকাশে উড়াল দেবে, পড়ে থাকবে শুধু ‘কল্পনা’। উচ্চৈস্বরে হেসে উঠেছিলেন আলমগীর ভাই। আসলে দলের দুজন গুরুত্বপূর্ণ নেতার মধ্যে ব্যক্তিবিশেষের কূটকৌশলে সৃষ্ট অহেতুক দূরত্ব দূর করতে পেরে আমি নিজেও তৃপ্তিবোধ করছিলাম। সেদিন তৎকালীন মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মধ্যে সৃষ্ট দূরত্ব ঘোচাতে আমি যেটা করেছিলাম, আসলে সেটাই হওয়া উচিত দলের একজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মীর কাজ। এটা অবশ্য সবাই করে না। বরং দূরত্ব বৃদ্ধি করে সে ফাঁক দিয়ে নিজেকে গলিয়ে মাথা তোলার চেষ্টা করে কেউ কেউ। এ ধরনের ব্যক্তিদের কাছে দল নয়, নিজের স্বার্থই বড়।
আমার আত্মতৃপ্তির জায়গাটা হলো, বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন একজন কর্মী হিসেবে যতদিন দলটির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম, মনপ্রাণ দিয়েই দলের পক্ষে কাজ করেছি। চেষ্টা করেছি, দলকে সুসংহত করে এর পরিধি বাড়াতে ক্ষুদ্র হলেও অবদান রাখতে। অথচ অনেককে দেখেছি, দলের কী হলো তাতে ভ্রূক্ষেপ নেই, নিজের স্বার্থটা আগে দেখে। অকপট মন্তব্যের জন্য পরিচিত বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ওয়ান-ইলেভেনের সময় দলে খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন ও আ স ম হান্নান শাহর মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টির ইন্ধনদাতা একজন মাঝারি পর্যায়ের নেতা সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘ও তো চায় দলকে ছোট করে নিজে বড় নেতা হতে।’ রাজনীতির কী অপার মহিমা! সেই মাঝারি নেতা এখন দলের ‘ভারপ্রাপ্ত’ বড় নেতা।
উদারতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের চরিত্রের একটি বড় বৈশিষ্ট্য। সমালোচনাসহিষ্ণু রাজনীতিবিদ তিনি। প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হয়ে ২০১৬ সালে দল থেকে পদত্যাগ করার পর পত্র-পত্রিকায় বিএনপির আন্দোলনে একের পর এক ব্যর্থতা, ভুল রাজনৈতিক স্ট্র্যাটিজি, শহীদ জিয়ার আদর্শ থেকে দূরে সরে যাওয়া ইত্যাদি বিষয় আমার কলামে তুলে ধরতে থাকি। বলাই বাহুল্য, মহাসচিব মির্জা আলমগীর ভাইও বাদ যাননি আমার সমালোচনার তীর থেকে। অনেক সময় ভাবতাম, তিনি হয়তো আমার ওপর ক্ষিপ্ত হচ্ছেন। কিন্তু আমি ছিলাম ভ্রান্ত। সম্ভবত ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশ প্রতিদিনের বর্ষপূর্তির অনুষ্ঠনে দেখা হলো তার সঙ্গে। পাশাপাশি বসেছিলাম। বললেন, ‘আমি কিন্তু আপনার সব লেখা পড়ি।’ বললাম, পড়ে নিশ্চয়ই গালমন্দ করেন’। চিরাচরিত হাসি দিয়ে বললেন, ‘আমি সবসময় সমালোচনাকে ইতিবাচকভাবেই নিই। সমালোচকরা তো শত্রু নয়, পরম বন্ধু। তাদের সমালোচনা আমার ভুল-ভ্রান্তি সংশোধনের সুযোগ করে দেয়’। বস্তুত এটাই একজন প্রকৃত রাজনীতিবিদের কথা। একজন রাজনীতিবিদ কখনোই সমালোচনাকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখেন না বা সমালোচককে শত্রু মনে করেন না। সমালোচনাকে যারা সহজভাবে গ্রহণ করতে পারেন, তারা আরোহণ করতে পারে রাজনীতির এভারেস্ট শৃঙ্গে। আর সমালোচনা যাদের গায়ে বিচ্ছুটির জ্বালা ধরায়, তারা শরীর চুলকাতেই সময় ব্যয় করে ফেলেন। পর্বতশৃঙ্গে ওঠা তাদের আর হয়ে ওঠে না।
রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে দেখেছি একজন নিষ্ঠাবান নেতা হিসেবে, সততা ও দেশপ্রেমে শহীদ জিয়াউর রহমানের সার্থক অনুসারী হিসেবে। আড়ম্বরহীন জীবনযাপন এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে সহজে মিশে যেতে পারার অসাধারণ গুণ এবং কথা বলার ক্ষেত্রে পরিমিতিবোধ তাকে করেছে তুমুল জনপ্রিয়। এমন একজন কিংবদন্তিতুল্য মানুষের সান্নিধ্যপ্রাপ্তি, তার স্নেহধন্য হওয়ার সুযোগ পাওয়া আমার জীবনের অন্যতম অধ্যায়। তার জন্য শুভকামনা অহর্নিশি।
লেখক: সহকারী সম্পাদক, প্রতিদিনের বাংলাদেশ
