ঢাকা বুধবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৬,
মোল্লাবাজার সেতু

৯ বছরেও জোড়া লাগেনি সেতু

বর্তমান সংবাদ | মো. ফরহাদ, মুন্সীগঞ্জ

এপ্রিল ২০, ২০২৬, ০৬:২৭ পিএম

৯ বছরেও জোড়া লাগেনি সেতু

মুন্সীগঞ্জ : মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান ও ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ সীমান্তবর্তী ধলেশ্বরীর শাখা নদীর ওপর নির্মাণাধীন ‘মোল্লাবাজার সেতু’ দীর্ঘ ৯ বছরেও আলোর মুখ দেখেনি। ২০১৮ সালে আড়ম্বরপূর্ণভাবে কাজ শুরু হওয়া ২৫২ মিটার দৈর্ঘ্যরে এই সেতুটি এখন স্থানীয়দের কাছে এক মূর্তমান আতঙ্কের নাম।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজ ফেলে চলে যাওয়া, এলজিইডির তদারকির অভাব এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় মাঝপথে থমকে আছে কয়েক লাখ মানুষের যাতায়াতের এই একমাত্র মাধ্যম। সেতুটি কবে নাগাদ শেষ হবে, তা নিয়ে বর্তমানে এক চরম ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় বলছেন, এই সেতুটি নির্মাণ শেষ হলে মুন্সীগঞ্জ সদর, টঙ্গীবাড়ী, লৌহজং ও সিরাজদিখান উপজেলার মানুষ মাত্র ৩০-৪০ মিনিটে মোল্লাবাজার হয়ে পোস্তগোলা দিয়ে ঢাকায় পৌঁছাতে পারতেন। বর্তমানে এই পথের জন্য ১৬ কিলোমিটার উন্নত পিচ ঢালাই সড়ক থাকলেও একটি সেতুর অভাবে তার কোনো সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।

মুন্সীগঞ্জবাসীকে এখন বিকল্প পথ হিসেবে ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে অথবা নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া ও পাগলা হয়ে ঢাকায় যেতে হচ্ছে, যেখানে অসহনীয় যানজটে সময় লাগছে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা। বিশেষ করে মুমূর্ষু রোগী নিয়ে অ্যাম্বুলেন্স পারাপারের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় স্থানীয়রা ঝুঁকি নিয়ে ট্রলার বা দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি জরাজীর্ণ ফেরিতে নদী পার হচ্ছেন।

এদিকে দীর্ঘ ৯ বছর ধরে ঝুলে থাকা এই উন্নয়ন কাজের ধীরগতির প্রতিবাদে এবং দ্রুত সেতুটি সম্পন্ন করার দাবিতে গত শুক্রবার সকালে সিরাজদিখান উপজেলার খাসমহল বালুচর এলাকায় এক বিশাল মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়। ‘সর্বস্তরের সচেতন নাগরিক এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনসমূহ’ ব্যানারে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার দুই থেকে তিন শতাধিক মানুষ অংশ নেন। মানববন্ধনকারীরা প্রথমে বালুচর স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদ্রাসার সামনে অবস্থান নেন এবং পরে একটি বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে মোল্লাবাজার এলাকায় গিয়ে কর্মসূচি শেষ করেন।

এ সময় বক্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ঠিকাদার ও প্রকৌশলীদের অবহেলার কারণে আমাদের জীবন থমকে আছে। অ্যাম্বুলেন্স পার হতে পারে না, কৃষিপণ্য নিতে পারি না। আমরা বছরের পর বছর শুধু আশ্বাস পাচ্ছি। দ্রুত কাজ শেষ না হলে আমরা আরও কঠোর কর্মসূচি দেব।

সরেজমিনে দেখা যায়, ধলেশ্বরী নদীর উত্তর পাড়ে তিনটি ও মূল সেতুর আটটি পিলার দৃশ্যমান হলেও পুরো প্রকল্পটি এখন এক বিশাল কংক্রিটের কঙ্কালে পরিণত হয়েছে। পিলারের ওপর গুটিকয়েক স্প্যান বসানো হলেও নদীর মাঝখানের দুটি পিলার এখনো স্প্যানহীন অবস্থায় বিচ্ছিন্নভাবে দাঁড়িয়ে আছে। পিলারের ওপরের খোলা রডগুলোতে মরিচা ধরেছে এবং দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ থাকায় সেতুর ওপর ও চারপাশে কাশফুল ও আগাছা জন্মেছে। দক্ষিণ প্রান্তে স্তূপ করে রাখা বিপুল পরিমাণ নির্মাণসামগ্রী ও লোহার পাত বছরের পর বছর রোদ-বৃষ্টিতে ভিজে নষ্ট হচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, মাত্র এক কিলোমিটার পশ্চিমে আধুনিক এলিভেটেড রেলওয়ে স্টেশন নির্মিত হলেও সামান্য এই সেতুর অভাবে বিশাল অঞ্চলের কৃষি ও ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়েছে। অথচ এই সড়ক দিয়ে পোস্তগোলা ব্রিজের দূরত্ব মাত্র ৬ কিলোমিটার; সেতুটির নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হলে যা হতো রাজধানীর সঙ্গে মুন্সীগঞ্জের সহজতম প্রবেশপথ।

এ পথে যাতায়াতকারী রফিকুল ইসলাম বলেন, মুন্সীগঞ্জ হতে ঢাকায় যাওয়ার এই রাস্তাটি একেবারে যানজটহীন। অন্য সড়ক দিয়ে ঢাকায় যেতে যেখানে দুই থেকে তিন ঘণ্টা সময় লাগে সেখানে এক সড়ক দিয়ে ১ ঘণ্টারও কম সময়ে যাওয়া যায়। সেতুটি হলে একদিকে যেমন আরও সময় বাঁচাত, অন্যদিকে সেতুর স্থল দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ট্রলার পারাপার হতেও মুক্তি পেতাম।

ঠিকাদার সুরমা এন্টারপ্রাইজের পরিচালক মাসুম আলী কাজ বন্ধ রাখার পেছনে এলজিইডি কর্মকর্তাদের দুর্নীতিকে দায়ী করেছেন। তিনি আক্ষেপের সঙ্গে বলেন, এলজিইডির লোকজনের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা করা উচিত। প্রকল্পের লোকজন বড় বড় ঠিকাদারি কোম্পানির কাছ থেকে মোটা অঙ্কের সুবিধা নিয়ে তাদের টাকা আগে ছাড় করে। আমাদের টাকা আটকে রাখায় আমরা কাজ চালিয়ে যেতে পারিনি। নির্মাণসামগ্রীর বর্তমান উচ্চমূল্যে এই কাজ করতে গেলে আমাদের চার কোটি টাকা লোকসান হতো, তাই আমরা গত ফেব্রুয়ারিতে কাজ থেকে ইস্তফা দিয়েছি।

সুরমা এন্টারপ্রাইজের পাহারাদার নিমাই শাহা জানান, কোম্পানি ঠিকমতো টাকা না পাওয়ায় কাজ ছেড়ে দিয়েছে, তিনি এখন কেবল পড়ে থাকা মালামাল পাহারা দিচ্ছেন।

কেরানীগঞ্জ এলজিইডি উপসহকারী প্রকৌশলী মো. শওকত আলী এই দীর্ঘসূত্রতার জন্য ঠিকাদারের গাফিলতিকেই প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, সেতুর কাজ এখন পর্যন্ত ৭০ ভাগ সম্পন্ন হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চরম অবহেলার কারণে সময়মতো কাজ শেষ করতে পারেনি। এজন্য গত দুমাস আগে সুরমা এন্টারপ্রাইজের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করা হয়েছে। বর্তমানে অবশিষ্ট কাজের জন্য নতুন করে ১৬ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ অনুমোদন হয়ে এলে নতুন করে দরপত্র আহ্বান করে দ্রুত পুনরায় কাজ শুরু করা হবে।

অন্যদিকে, চলতি বছরের শুরুতে উপজেলা প্রকৌশলী মোহাম্মদ আরিফুর রহমান এপ্রিলের মধ্যে কাজ শেষের আশ্বাস দিলেও বাস্তবে স্প্যান ও ভায়াডাক্টের কাজ এখনো বাকি থাকায় অনিশ্চয়তা আরও ঘনীভূত হয়েছে।

এমটিআই

বর্তমান সংবাদ

Link copied!